মেনু নির্বাচন করুন
পাতা

মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধা

সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

১. পটভূমিঃ

আমাদের জাতীয় ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম অধ্যায় হলো একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ। এইমুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে জন্মলাভ করে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ।

 

১৯৪৭ সালের ১৮ জুলাই ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেন্ডেন্স এ্যাক্টে ভারতবর্ষের দুটিপ্রধান মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চল নিয়ে পাকিস্তান নামের রাষ্ট্র গঠনের প্রস্তাবকরা হয়। ১২ আগস্ট প্রকাশিত র্যাডক্লিপ রোয়েদাদে পূর্ব বঙ্গ ও পশ্চিমবঙ্গেঁর মধ্যে সীমানা আনুষ্ঠানিকভাবে নির্ধারিত হয়। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠাহলো ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট। পূর্ব বাংলা হয় পাকিস্তানের অংশ-পূর্ব পাকিস্তান।পূর্ব থেকে জনগণ আশা করেছিলেন, এবার তাঁদের আশা-আকাঙ্খা পূরণ হবে। তাঁদেরপ্রত্যাশিত স্বাধীনতা নতুন রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠিত হবে। উন্নত জীবনের অধিকারীহবেন। কিছুদিনের মধ্যেই পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ অনুভব করলেন, তাদেরপ্রত্যাশা পূর্ণ হওয়ার নয়। পাকিস্তানের শাসকবর্গ বহুবাচনিক সমাজে পূর্বপরিকল্পিত ঐক্যবদ্ধ একক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার ষড়যন্ত্র করেছে। রাজনৈতিকক্ষেত্রে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের অংশগ্রহণের ক্ষেত্র সংকুচিত করা হচ্ছে।অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে তাঁরা বঞ্চনার শিকার হয়েছেন। এমন কি পূর্ব পাকিস্তানেরসম্পদে পশ্চিম পাকিস্তানের উন্নয়ন নিশ্চিত করার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

এভাবে পূর্ব পাকিস্তানে স্বাধীনতা সংগ্রামের পটভূমি তৈরি হয়। ১৯৫২ সালেনিজস্ব ভাষার অধিকার রক্ষার জন্য জীবন দান করতে হয় পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্রজনতার। ১৯৫৮ সালে জেনারেল আইয়ুব খান সামরিক শাসন জারি করে ক্ষমতা দখল করে।১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙ্গালীরস্বায়ত্বশাসন প্রতিষ্ঠা করার লক্ষে ছয় দফা দাবি পেশ করেন। ছয় দফা ম্যান্ডেটনিয়ে পাকিস্তানে ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর সর্বপ্রথম অনুষ্ঠিত সাধারণনির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়লাভকরে আওয়ামী লীগ। পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে তারউত্তরণ ঘটে। জনগণ প্রত্যাশা  করেছিল নির্বাচিত রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগসরকার গঠন করে পূর্ব পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের বঞ্চনার ইতিহাসের গতিপাল্টাবেন। পাকিস্তানের শাসকবর্গ-কিছু রাজনৈতিক নেতা এবং কিছু সামরিককর্মকর্তা-ষড়যন্ত্রের গ্রন্থিগুলো এমনভাবে বিন্যস্ত করেন যেন শাসন ক্ষমতাকোনক্রমে বাঙ্গালীর হস্তগত না হয়। পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ তা সঠিকভাবেঅনুধাবন করেন।

২. ভাষা আন্দোলনঃ

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ বাংলাকে অন্যতমরাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানিয়ে আসছিল। পাকিস্তান সরকার এ যৌক্তিক দাবিরসম্পূর্ণ বিরোধিতা করে ১৯৪৮ সালেই উর্দুকে একমাত্র সরকারি ভাষা হিসেবেঘোষণা করে। এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান প্রতিবাদ চলতে থাকে যাপরবর্তীতে ভাষা আন্দোলন নামে পরিচিতি লাভ করে। এ আন্দোলন পুনরুজ্জীবিত হয়১৯৫২ সালে এবং সেই বছরের ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষার দাবিতে ঢাকা বিশববিদ্যালয়প্রাঙ্গনে ছাত্ররা একত্রিত হয়। পুলিশ এ জনসমাবেশের উপর গুলি চালানোর ফলেরফিক, সালাম, বরকত, জববারসহ আরো অনেকে শহীদ হয়। এই ঘটনা আন্দোলনকে এক নতুনমাত্রা দান করে এবং রাজনৈতিক গুরুত্ব বহুমাত্রায় বাড়িয়ে দেয়। ১৯৫৬ সালেচূড়ান্তভাবে সংবিধানে বাংলাকে উর্দূর পাশাপাশি অন্যতম প্রধান জাতীয় ভাষাহিসেবে গ্রহণ করা হয়। ভাষা আন্দোলনকে পূর্ব পাকিস্তানে বাঙালি জাতীয়তাবাদেরউত্থান হিসেবে উল্লেখ করা হয় এবং ৬ দফা আন্দোলন, ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানবাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে বিবেচনা করাহয়।

৩. ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট সাধারণ নির্বাচন ও ১৯৫৮ সালের সামরিক শাসনঃ

১৯৫৪ সালে ১০ই মার্চ পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনে পূর্ববঙ্গেযুক্তফ্রন্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করে। কিন্তু পাকিস্তানশাষকগোষ্ঠী বাঙালির এই আধিপত্য মেনে নিতে পারেনি। মাত্র আড়াই মাসের মধ্যে৩০শে মে কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশে মন্ত্রিসভা ভেঙ্গে দিয়ে রাষ্ট্রপতিশাসন জারি করা হয়। ১৯৫৯ সালে সমগ্র পাকিস্তানে সাধারণ নির্বাচনের সময়নির্ধারিত হলে বাঙালিদের মধ্যে বিপুল সাড়া দেখা দেয়। জনসংখ্যার ৫৬ ভাগবাঙালি, অতএব এই নির্বাচনের ফলাফল চিন্তা করে কেন্দ্রীয় সরকার নির্বাচনবানচালের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। একই সময়ে সামরিক বাহিনী ক্ষমতা দখলের কৌশলেকেন্দ্রীয় সরকারের মধ্যেও বিরোধ সৃষ্টি করে। এই ধারাবাহিকতায় ১৯৫৮ সালের ৭ইঅক্টোবর    পাকিস্তানে সামরিক শাসন জারি হয়। ১৯৬২ সালে সামরিক শাসন তুলেনেয়া হ'লে ছাত্র সমাজ অধিকারের দাবিতে পুনরায় আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটায়।

৪. ১৯৬২ সালের শিক্ষা সংকোচন নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলনঃ

পাকিস্তান সরকারের শিক্ষা সংকোচন নীতির বিরুদ্ধে এই সময় দেশব্যাপী শাসনতুলে নেয়ার পর ছাত্রদের এই আন্দোলন নতুন করে গণ-আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটায়।শিক্ষা সংকোচন নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলনরত ছাত্র মিছিলের উপর পুলিশের গুলিতে১৭ই সেপ্টেম্বর নিহত হন যার মধ্যে ওয়াজিউল্ল­া, মোস্তফা ও বাবুল অন্যতম।ছাত্র সমাজের ২২ দফা দাবিকে কেন্দ্র করে ১৭ই সেপ্টেম্বর ’৬৩ ‘শিক্ষা দিবস’ পালন উপলক্ষে দেশব্যাপী দুর্বার আন্দোলন গড়ে ওঠে। রাজনৈতিক দলসমূহ ওবুদ্ধিজীবী সমাজ ছাত্রদের এই আন্দোলনের সবরকম সমর্থন নিয়ে এগিয়ে আসে।

৫. ছাত্র সমাজের সশস্ত্র আন্দোলনের প্রস্ত্ততিঃ

পাকিস্তানের কাঠামোয় বাঙালি জাতিসত্তার বিকাশ ঘটা অসম্ভব বিবেচনা করেতৎকালীন ছাত্র সমাজের নেতৃস্থানীয় কয়েকজন ১৯৬২ সালে গোপনে ছাত্রদের সংগঠিতকরার প্রচেষ্টা গ্রহণ করেন। বাঙালি জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ এই ছাত্র সংগঠনেরনেতৃত্ব দেন জনাব সিরাজুল আলম খান, জনাব আবদুর রাজ্জাক এবং কাজী আরেফআহমেদ। এই সংগঠন ‘স্বাধীন বাংলা বিপ্ল­বী পরিষদ’ নামে পরিচিত ছিল।

৬. ৬৬ এর ৬ দফা আন্দোলনঃ

১৯৬৫ সালে পাকভারত যুদ্ধের সময়কালে বাস্তব ক্ষেত্রে প্রমাণিত হয় পূর্ববাংলা সম্পূর্ণভাবে অরক্ষিত ছিল। স্পষ্ট হয়ে ওঠে পাকিস্তানের সামরিক শাসকগণসামাজিক, সাংস্কৃতিক নিপীড়ন ও অর্থনৈতিক শোষণের ধারাবাহিকতায় পূর্ববাংলারনিরাপত্তা ব্যবস্থার ন্যূনতম উন্নতি করার প্রচেষ্টা গ্রহণ করেনি। বাঙালিদেরপ্রতি জাতিগত এই বৈষম্যের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে ১৯৬৬ সালের ৫ই ফেব্রুয়ারীলাহোরে আহুত ‘সর্বদলীয় জাতীয় সংহতি সম্মেলন’ শেখ মুজিবর রহমান ৬ দফা দাবীউপস্থাপন করেন। ভাষণে তিনি বলেন, ‘গত দুই যুগ ধরে পূর্ব বাংলাকে যেভাবেশোষণ করা হয়েছে তার প্রতিকারকল্পে এবং পূর্ব বাংলার ভৌগোলিক দূরত্বের কথাবিবেচনা করে আমি ৬ দফা প্রস্তাব উত্থাপন করছি।’ পরবর্তীতে এই ৬ দফা দাবিবাঙালি জাতির মুক্তিসনদ হিসাবে বিবেচিত হয়।

৭. আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলাঃ

বাঙালির জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে সামরিক বাহিনীর কিছু সংখ্যকসদস্য রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সহযোগিতায় লেঃ কমান্ডার মোয়াজ্জেমের নেতৃত্বেপূর্ব বাংলাকে বিচ্ছিন্ন করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলের এক প্রচেষ্টা গ্রহণকরে। সংগঠনের কোন এক সদস্যের অসতর্কতার ফলে পাকিস্তান সরকারের কাছে এইপরিকল্পনার কথা ফাঁস হয়ে পড়ে। পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার ষড়যন্ত্রে১৯৬৭ সালের ডিসেম্বর মাসে পাকিস্তান সরকার সামরিক বেসামরিক ২৮ ব্যক্তিকেগ্রেফতার করে। ১৯শে জুন ‘৬৮ পাকিস্তান সরকার শেখ মুজিবর রহমানসহ ৩৫ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে এক রাষ্ট্রদ্রোহী মামলা দায়ের করে। এই মামলা‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’ নামে পরিচিত।

১৯শে জুন ১৯৬৮, ঢাকা সেনানিবাসে এই মামলার বিচার শুরু হয়। বিচার কার্যচলার সময় থেকে শ্লোগান ওঠে- ‘জেলের তালা ভাঙব- শেখ মুজিবকে আনব।’ এইগণ-আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় বলা যায়, এই সময় সমস্ত দেশব্যাপী সরকার বিরোধীআন্দোলন পূর্ণতা লাভ করে।

৮. ৬৯ এর গণ-আন্দোলনঃ

পূর্ব-বাংলার স্বায়ত্বশাসনের দাবিতে জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক দল ও ছাত্রসংগঠনগুলোর সমন্বয়ে দেশব্যাপী আন্দোলন গড়ে ওঠে। রাজনৈতিক শ্লোগান পরিবর্তিতহয়। ‘তোমার আমার ঠিকানা- পদ্মা মেঘনা যমুনা।’ পিন্ডি না ঢাকা- ঢাকা ঢাকা।‘জাগো জাগো-বাঙালি জাগো’। এই ধারাবাহিকতায় স্বায়ত্বশাসনের আন্দোলনবাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের পথকে উন্মক্ত করে। অহিংস আন্দোলন সহিংসতারদিকে ধাবিত হতে থাকে। এই সময় রাজনৈতিক দলের ৬ দফা দাবি গণদাবিতে পরিণত হয়।বাঙালি একক জাতিসত্তার আন্দোলনের ফলশ্রুতিতে পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতিজেনারেল আইয়ুব খান দেশে সামরিক শাসন জারি করে সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেলইয়াহিয়া খানের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। এই গণ-আন্দোলনের সময় পুলিশেরগুলিতে ২০শে জানুয়ারী’ ৬৯ ছাত্র আসাদুজ্জামান এবং ২৪শে জানুয়ারী’৬৯ স্কুলছাত্র মতিউর রহমান মৃত্যুবরণ করে। ছাত্র আন্দোলনের ভূমিকায় শহীদ আসাদ-মতিউরদুটি উল্লেখযোগ্য নাম। শেরে বাংলা নগর ও মোহাম্মদপুরের সংযোগ স্থলের আইয়ুবগেটের নাম পরিবর্তন করে ‘আসাদ গেট’ এবং বঙ্গভবনের সামনের উদ্যানের নাম‘মতিউর রহমান শিশু উদ্যান’ করা হয়। জানুয়ারী ’৬৯ এ গৃহিত ছাত্রদের ১১ দফাআন্দোলনকে আরও বেগবান করে।

১৫ই ফেব্রুয়ারি’ ৬৯ পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গুলিতে আহত অবস্থায় বন্দীআগরতলা মামলায় অভিযুক্ত সার্জেন্ট জহুরুল হক মৃত্যুবরণ করেন। ১৮ইফেব্রুয়ারি’ ৬৯ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ডঃ শামসুজ্জোহা পুলিশেরগুলিতে নিহত হন। এই মৃত্যু সংবাদ গণ-আন্দোলনে আরেকটি নতুন মাত্রা যুক্তকরে। প্রচন্ড-আন্দোলনের মুখে পাকিস্তান সরকার ২১শে ফেব্রুয়ারি’ ৬৯ এই মামলাপ্রত্যাহার করতে বাধ্য হন। ২২শে ফেব্রুয়ারি’ ৬৯, শেখ মুজিবর রহমানসহঅভিযুক্ত সকলেই ঢাকা সেনানিবাস থেকে মুক্তি লাভ করেন। এই আন্দোলনের মধ্যদিয়ে শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতির একক এবং অবিসংবাদিত নেতা হিসাবেআত্মপ্রকাশ করেন। ২৩শে ফেব্রুয়ারি’ ৬৯ সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পক্ষথেকে ঢাকা রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) এক বিশালগণ-সম্বর্ধনায় শেখ মুজিবর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়।

এই মামলায় অভিযুক্ত ও বন্দী অবস্থায় সেনাবাহিনীর গুলিতে নিহত সার্জেন্টজহুরুল হক ও ডঃ শামসুজ্জোহাকে জাতি শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে। উভয়েই স্বাধীনতাআন্দোলনের অন্যতম সৈনিক হিসাবে চিহ্নিত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সার্জেন্টজহুরুল হক হল’ ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘শামসুজ্জোহা হল’ তাদের স্মরণেনামকরণ করা হয়েছে।

’৬৯ এর এই ছাত্র আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন সিরাজুল আলম খান, আবদুররাজ্জাক, কাজী আরেফ আহমেদ, আবদুর রউফ, খালেদ মোহাম্মদ আলী, তোফায়েল আহমেদ, আসম আবদুর রব, নূরে আলম সিদ্দিকী, শাহজাহান সিরাজ, সামসুদ্দোহা, মোস্তফাজামাল হায়দর, রাশেদ খান মেনন, বেগম মতিয়া চৌধুরী, দীপা দত্ত, হায়দর আকবরখান রণোসহ অনেকে।

রাজনৈতিক দলীয় প্রধান যাদের নিরলস পরিশ্রম ও নির্দেশনায় বাঙালিরআত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের এই আন্দোলন পূর্ণতা লাভ করেছিল তাদের মধ্যে জননেতামওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান, কমরেড মনিসিং, অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমেদ, শ্রীমনোরঞ্জন ধর অন্যতম।

৯. ৭০ এর সাধারণ নির্বাচনঃ

২৫শে মার্চ ৬৯ সারা দেশে সামরিক শাসন জারির মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাহস্তান্তর হলেও সামরিক সরকার গণ-দাবিকে উপেক্ষা করার মত শক্তি সঞ্চয় করতেপারেনি। তাই প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক জেনারেল আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খানসারা দেশে এক ব্যক্তি এক ভোটের নীতিতে সাধারণ নির্বাচন দিতে বাধ্য হন। ৭ইডিসেম্বর ’৭০ থেকে ১৯শে ডিসেম্বর’ ৭০ এর মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে বলেতফসিল ঘোষণা করা হয় এবং শান্তিপূর্ণভাবে দেশব্যাপী এই নির্বাচন অনুষ্ঠিতহয়। নির্বাচনে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ ৬ দফা ও বাঙালি জাতীয়তাবাদের পক্ষেরায় প্রদান করে। এই নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ জাতীয় পরিষদে৩১০ আসনের মধ্যে ১৬৭ আসনে জয়লাভ করে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়েকেন্দ্রীয় সরকার গঠনের ম্যান্ডেট লাভ করে।

 

‘বাঙালির শাসন মেনে নেওয়া যায় না’ এই নীতিতে পাকিস্তানি সামরিক শাসকগণনির্বাচিত এই  জন প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রতিবন্ধক হয়েউঠে। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাংলার জাতীয় নেতৃবৃন্দ এর প্রতিবাদে রুখেদাঁড়ায়। শুরু হয় অধিকারের সংঘাত। ছাত্র সমাজ এই আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগকরে। ৭০ এ বঙ্গবন্ধু এক কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানে পূর্ব বাংলার ম্যাপ অংকিত একটিপতাকা প্রদান করেন। এই পতাকাই পরবর্তীতে বাংলাদেশের পতাকা হিসাবে গৃহীতহয়। ছাত্রদের এই সংগঠন প্রতিরোধ যুদ্ধের প্রস্ত্ততি গ্রহণ করে প্রতিটি জেলাও মহকুমা শহরে শুরু হয় সামরিক প্রশিক্ষণের মহড়া। জাতীয়তাবাদী এই আন্দোলনেছাত্র ও যুব সমাজের অংশগ্রহণ জন সমাজকে আরো উৎসাহিত করে তোলে।

১০. ৭১ এর অসহযোগ আন্দোলনঃ

নির্বাচনে জয়লাভের পর পাকিস্তানের সামরিক শাসক জেনারেল আগা মোহাম্মদইয়াহিয়া খান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সরকার গঠনে মত দিতে অস্বীকারকরেন। একটি রাজনৈতিক দল জনগণের ভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠনেরম্যান্ডেট পেয়েছে। তারা সরকার গঠন করবে, এটাই ছিল বাস্তবতা। কিন্তু সামরিকশাসকগণ সরকার গঠন বা নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরেরপ্রক্রিয়া বাদ দিয়ে এক আলোচনা শুরু করে। কিসের জন্য আলোচনা, এটা বুঝতেবাঙালি নেতৃবৃন্দের খুব একটা সময় লাগেনি। জাতীয় সংসদের নির্ধারিত অধিবেশনস্থগিতের প্রতিবাদে বঙ্গবন্ধু ১লা মার্চ ১৯৭১ দেশব্যাপী অসহযোগের আহবানজানান। সর্বস্তরের জনগণ একবাক্যে বঙ্গবন্ধুর এই আহবানে সাড়া দিয়ে পূর্বপাকিস্তানের সমস্ত প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে অচল করে তোলে। ২রামার্চ ৭১ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের পতাকা প্রদর্শিতহয়। ৩রা মার্চ ’৭১ এ রমনা রেসকোর্স (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে)‘স্বাধীন বাংলাদেশ ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’ এর পক্ষ থেকে ‘স্বাধীনতার ইসতেহার’ পাঠ করা হয়। এই ইসতেহারে ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি’ গানটিকেজাতীয় সঙ্গীত হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয় এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানেরনেতৃত্বের প্রতি আস্থা রেখে সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।

পাকিস্তান সামরিক বাহিনী পরিচালিত সরকার জাতীয় পরিষদের নির্বাচিতপ্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের বিষয়ে কোন সমাধান না দেওয়ায়, ৭ইমার্চ ১৯৭১ বঙ্গবন্ধু রহমান রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দীউদ্যান) সমগ্র বাঙালি জাতিকে এক দিকনির্দেশনী ভাষণে সর্বপ্রকার পরিস্থিতিমোকাবেলার জন্য প্রস্ত্তত হতে আহবান জানান। এই ভাষণে তিনি বলেন, ‘‘আমি যদিহুকুম দেবার নাও পারি, তোমাদের কাছে আমার অনুরোধ রইল, ঘরে ঘরে দূর্গ গড়েতোল। ......... এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রামআমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম।’’ বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণ পৃথিবীতে উল্লেখযোগ্যনেতৃবৃন্দের ভাষণগুলির মধ্যে অন্যতম একটি হিসাবে বিবেচিত।

৭ই মার্চের এই ভাষণে বঙ্গবন্ধুর এই নির্দেশ কোন দলীয় নেতার নির্দেশ ছিলনা। ছিল একজন জাতীয় নেতার নির্দেশ। এই নির্দেশ দেশের সর্বস্তরের ছাত্র, জনতা ও বুদ্ধিজীবীদের সাথে বাঙালি সামরিক, বেসামরিক কর্মকর্তা ও কর্মচারীসকলকেই সচেতন করে তোলে। ২রা মার্চ ৭১ থেকে পূর্ব বাংলার সমস্ত প্রশাসনিককাজকর্ম চলতে থাকে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে।

২৩শে মার্চ ৭১ সকালে পল্টন ময়দানে জয় বাংলা বাহিনীর এক কুচকাওয়াজঅনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠান শেষে এই বাহিনীর নেতৃবৃন্দ মিছিল সহকারে বাংলাদেশেরপতাকাসহ বঙ্গবন্ধু ভবনে প্রবেশ করে আনুষ্ঠানিকভাবে বাড়িতে এই পতাকা উত্তোলনকরেন। একই সাথে বঙ্গবন্ধুর গাড়িতে এই পতাকা লাগান হয়। ২৩শে মার্চ পূর্ববাংলার প্রতিটি শহরে পাকিস্তান দিবসের অনুষ্ঠান বর্জিত হয় এবং   পাকিস্তানের পতাকার পরিবর্তে বাংলাদেশের পতাকা উড়তে দেখা যায়।

অন্যদিকে ক্ষমতার হস্তান্তরের নামে এই আলোচনা চলা অবস্থায় পাকিস্তানসামরিক বাহিনীর মুখপাত্র  জনাব জুলফিকার আলী ভুট্টো সৃষ্ট সমস্যার রাজনৈতিকসমাধানের পরিবর্তে নতুন করে সংকটের সৃষ্টি করে। অযৌক্তিক দাবি উপস্থাপনেরফলে সুষ্ঠু রাজনৈতিক সমাধানের পথ এক সময় রুদ্ধ হয়ে পড়ে। পাকিস্তান সামরিকশাসকগণ স্বার্থান্বেষী মহলের সাথে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে সামরিক ক্ষমতাপ্রয়োগের প্রস্ত্ততি গ্রহণ করে। একটি পরিকল্পিত হত্যাকান্ডের জন্য রাজনৈতিকআলোচনার আড়ালে সামরিক বাহিনী মাত্র ২২ দিনে দুই ডিভিশন অবাঙালি সৈন্যপাকিস্তান থেকে পূর্ব বাংলায় স্থানান্তরে সক্ষম হয়। বাস্তবতায় এটিই ছিলতাদের আলোচনার নামে কালক্ষেপণের মূল উদ্দেশ্য। ২৪শে মার্চ ৭১ সামরিক শাসকগণহেলিকপ্টার যোগে সমস্ত সেনানিবাসে এই আক্রমণের পরিকল্পনা হস্তান্তর করে।বাঙালি জাতির উপর পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর এই কুখ্যাত হত্যাযজ্ঞের নির্দেশনামা ‘‘অপারেশন সার্চ লাইট’’ নামে পরিচিতি।

২৫শে মার্চ ৭১ রাত্র ১১টায় পাকিস্তান সেনাবাহিনী অতর্কিত আক্রমণেরপ্রস্ত্ততি নিয়ে সেনানিবাস অথবা আক্রমণ প্রস্ত্ততিস্থানগুলি ত্যাগ করে। একইসাথে ঢাকাসহ দেশের সমস্ত বড় শহর ও সেনানিবাসের বাঙালি রেজিমেন্টসমূহআক্রান্ত হয়। সেনাবাহিনীর হাতে বঙ্গবন্ধু রাত ১২টা ৩০ মিনিটে ধানমন্ডিবাসভবন থেকে বন্দী হবার পূর্বে তিনি দলীয় নেতৃবন্দেকে করণীয় বিষয়ে যথাযথনির্দেশ দিয়ে অবস্থান পরিবর্তনের কথা বলেন। একই সাথে তিনি বাংলাদেশকে একটিস্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসাবে ঘোষণা করেন। বঙ্গবন্ধুর এই ঘোষণা বিভিন্নমাধ্যমে প্রচারিত হয়।

১১. অপারেশন সার্চলাইট ও ২৫ মার্চের গণহত্যাঃ

 

২৫ মার্চ পাকিস্তান সেনাবাহিনী পূর্ব পাকিস্তানের বড় শহরগুলোতে গণহত্যাশুরু করে। তাদের পূর্বপরিকল্পিত এই গণহত্যাটি ‘‘অপারেশন সার্চলাইট’’ নামেপরিচিত। এ গণহত্যার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আগে থেকেই পাকিস্তান আর্মিতেকর্মরত সকল বাঙালি অফিসারদের হত্যা কিংবা গ্রেফতার করার চেষ্টা করা হয়।ঢাকার পিলখানায়, ঢাকার রাজারবাগ পুলিশ লাইন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রামের ই বি আর সিসহ সারাদেশের সামরিক আধাসামরিক সৈন্যদেরকেনির্মমভাবে হত্যা করা হয়। এই হত্যাকান্ডের কথা যেন বহির্বিশব না জানতে পারেসে জন্য আগেই সকল বিদেশি সাংবাদিকদের গতিবিধির উপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়এবং অনেককে দেশ থেকে বের করে দেয়া হয়। তবে ওয়াশিংটন পোস্টের বিখ্যাতসাংবাদিক সাইমন ড্রিং জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাংলাদেশের রিপোর্ট প্রকাশ করেন।এর মধ্য দিয়ে বিশ্ব এই গণহত্যা সম্পর্কে অবগত হয়। আলোচনার নামে প্রেসিডেন্টইয়াহিয়ার কালক্ষেপণও এই গণহত্যা পরিকল্পনারই অংশ ছিল।

 

 Image

 

২৫ মার্চ রাত প্রায় সাড়ে এগারোটার দিকে পাকিস্তানি বাহিনী তাদেরহত্যাযজ্ঞ শুরু করে। পাকিস্তানিদের অপারেশনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ঢাকাবিশববিদ্যালয়ের সার্জেন্ট জহুরুল হক হল এবং জগন্নাথ হলের ছাত্রদেরনির্বিচারে হত্যা করা হয়। ঢাকা বিশববিদ্যালয় ও আশেপাশের বহু সংখ্যক শিক্ষক ওসাধারণ কর্মচারিদেরও হত্যা করা হয়। পুরোনো ঢাকার হিন্দু সম্প্রদায়অধ্যুষিত এলাকাগুলোতেও চালানো হয় ব্যাপক গণহত্যা। রাজারবাগ পুলিশ লাইনেআক্রমণ করে হত্যা করা হয় পুলিশ বাহিনীর বহু সদস্যকে। পিলখানার ইপিআর-এরকেন্দ্রে আচমকা আক্রমণ চালিয়ে নির্বিচারে হত্যা করা হয় নিরস্ত্র সদস্যদের।কয়েকটি পত্রিকা অফিস ভস্মীভূত করা হয়। দেশময় ত্রাস সৃষ্টির লক্ষ্যেনির্বিচারে হত্যা করা হয় বিভিন্ন এলাকায় ঘুমন্ত নর-নারীকে। হত্যা করা হয়শিশু ও বয়স্ক ব্যক্তিদেরও। ধারণা করা হয়, সেই রাত্রিতে একমাত্র ঢাকা  ও তারআশে পাশের এলাকাতে প্রায় এক লক্ষ নিরীহ নর-নারীর জীবনাবসান ঘটে।  

১২. স্বাধীনতার ঘোষণাঃ

২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান বাংলাদেশেরস্বাধীনতা ঘোষণা করেন। এই ঘোষণায় তিনি পাকিস্তানি সশস্ত্রবাহিনীর বিরুদ্ধেসর্বাত্মক সংগ্রামের জন্য বাংলার জনগণকে আহবান জানান। চট্ট্রগ্রামে তৎকালীনইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের ট্রান্সমিটারের মাধ্যমে প্রচারের জন্য পাঠানোহয়। ২৬ মার্চ চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধু ঘোষণাকে অবলম্বন করেচট্টগ্রাম আওয়ামী লীগ নেতা এম. এ হান্নান স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন। ২৭মার্চ অপরাহ্নে চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে ৮ম ইস্টবেঙ্গলরেজিমেন্টের মেজর জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের পক্ষে স্বাধীনতারআরেকটি ঘোষণা পাঠ করেন। এই ঘোষণাটিতে তিনি উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশে শেখমুজিবর রহমানের নেতৃত্বে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠিত হয়েছে। তিনিআরো উল্লেখ করেন যে, নবগঠিত এই রাষ্ট্রের সরকার জোটবদ্ধ না হয়ে বিশেবর অপররাষ্ট্রগুলোর সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক সৃষ্টিতে আগ্রহী। এছাড়াও এ ঘোষণায়সারা বিশেবর সরকারগুলোকে বাংলাদেশে সংঘটিত গণহত্যার বিরুদ্ধে জনমত গড়েতোলারও আহ্বান জানানো হয়। (বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের দলিলপত্র: মুজিবনগরপ্রশাসন, তৃতীয় খন্ড, প্রকাশকাল: নভেম্বর ১৯৮২) 

১৩.    গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার গঠনঃ

১০ই এপ্রিল ৭১ নির্বাচিত সাংসদগণ আগরতলায় একত্রিত হয়ে এক সর্বসস্মতসিদ্ধান্তে সরকার গঠন করেন। এই সরকার স্বাধীন সার্বভৌম ‘‘গণ-প্রজাতন্ত্রীবাংলাদেশ সরকার’’। স্বাধীনতার সনদ (Charter of Independence) বলে এইসরকারের কার্যকারিতা সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত হয়।  ১৭ই এপ্রিল ৭১ মেহেরপুরমহকুমার ভবেরপাড়া গ্রামে বৈদ্যনাথ তলায় ‘‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার’’ আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ গ্রহণ করেন। রাষ্ট্রপতি পদ্ধতির এই সরকারের মন্ত্রীপরিষদ সদস্যদের শপথ পাঠ করান জাতীয় সংসদের স্পীকার অধ্যাপক ইউসুফ আলী। যেসমস্ত নেতৃবৃন্দকে নিয়ে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার গঠিত হয় তাঁরা হলেনঃ

 

১।       রাষ্ট্রপতি          বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান (পাকিস্তানে বন্দী)

২।       উপ-রাষ্ট্রপতি     সৈয়দ নজরুল ইসলাম (ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি)

৩।       প্রধানমন্ত্রী        তাজউদ্দিন আহমেদ (প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত)

৪।       অর্থমন্ত্রী           ক্যাপ্টেন মনসুর আলী (শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত)

৫।       পররাষ্ট্রমন্ত্রী       খন্দকার মোশতাক আহমেদ (আইন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত)

৬।      স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী        এ এইচ এম কামরুজ্জামান (ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত)

 

এই অনুষ্ঠানে উপরাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতিহিসাবে (বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে) এবং কর্নেল এম এ জি ওসমানী মুক্তিবাহিনীরপ্রধান সেনাপতি হিসাবে দায়িত্ব পালন করবেন বলে সরকারী সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।দেশ বিদেশের শতাধিক সাংবাদিক ও হাজার হাজার দেশবাসীর উপস্থিতিতে এই শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন সাংসদ জনাব আবদুল মান্নান। নবগঠিত সরকারেরভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতিকে আনুষ্ঠানিকভাবে গার্ড অব অনার দেয়া হয়। বাঙালিরপ্রাণপুরুষ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে এই স্থানটির নামকরণ করা হয়‘‘মুজিব নগর’’।

 

মুক্তিযুদ্ধ ছিল একটি জনযুদ্ধ। দেশের সর্বস্তরের মানুষ এই যুদ্ধেঅংশগ্রহণ করে। রাজনৈতিকভাবে এই যুদ্ধকে সার্বজনীন করার লক্ষ্যেগণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার সর্বসম্মতিক্রমে একটি ‘‘সর্বদলীয় উপদেষ্টাপরিষদ’’ গঠন করেন। এই উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ছিলেনঃ

 

ক)      জনাব আব্দুল হামিদ খান ভাসানীসভাপতি                 ন্যাপ ভাসানী

খ)       শ্রী মনি সিং                                   সভাপতি        বাংলাদেশ কমিউনিষ্ট পার্টি

গ)       অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমেদ              সভাপতি        ন্যাপ মোজাফ্ফর

ঘ)       শ্রী মনোরঞ্জন ধর                              সভাপতি        বাংলাদেশ জাতীয় কংগ্রেস

ঙ)       জনাব তাজউদ্দিন আহমেদ                  প্রধানমন্ত্রী       পদাধিকারবলে

চ)       খন্দকার মোশতাক আহমেদ                পররাষ্ট্রমন্ত্রী      পদাধিকারবলে

 

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার অত্যন্ত দক্ষতার সাথে ৯ মাসব্যাপীসশস্ত্র এই মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করেন। মুক্তিবাহিনীর প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, অস্ত্র গোলাবারুদ সরবরাহ, খাদ্য ও চিকিৎসার ব্যবস্থাসহ সরকার প্রায় এককোটি শরণার্থীর দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। কূটনৈতিক দক্ষতার মাধ্যমে বিশ্বেরকাছে মুক্তিযুদ্ধের বাস্তবতায় উপস্থাপনসহ এবং একটি সময় উপযোগী প্রশাসনিককাঠামো গড়ে তুলতে সক্ষম হন।

পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও তাদের সহযোগী রাজাকারদের অত্যাচারে প্রায় এককোটি বাঙালি দেশ ত্যাগ করে পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্যহয়। ভারত সরকার ও ভারতের জনগণ দেশত্যাগী এই জনগোষ্ঠীর সার্বিক সাহায্যেএগিয়ে আসেন। ভারত সরকার বাংলাদেশ সরকারকে সার্বিকভাবে সহযোগিতা দান করেন।

মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশ সরকারের প্রশাসনিক কাঠামোয় কর্মরত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গঃ

১।       যে সমস্ত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব প্রশাসনিক কাঠামোয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেনঃ

ক)      রাষ্ট্রপতির পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা         জনাব আবদুস সামাদ আজাদ, এম এন এ

খ)       প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা                            ব্যারিষ্টার আমিরুল ইসলাম, এম এন এ

গ)       তথ্য মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত                     জনাব আবদুল মান্নান, এম এন এ

ঘ)       জয় বাংলা পত্রিকার উপদেষ্টা                 জনাব জিল্লুর রহমান, এম এন এ

ঙ)       যুব শিবির নিয়ন্ত্রণ পরিষদ চেয়ারম্যান      অধ্যাপক ইউসুফ আলী, এম এন এ

 

২।       বেসামরিক প্রশাসনঃ

 ক)      ক্যাবিনেট সচিব          জনাব হোসেন তৌফিক ইমাম (এইচ টি ইমাম)

খ)       মুখ্য সচিব                 জনাব রুহুল কুদ্দুস

গ)       সংস্থাপন সচিব           জনাব নূরুল কাদের খান

ঘ)       অর্থ সচিব                 জনাব খন্দকার আসাদুজ্জামান

ঙ)       পররাষ্ট্র সচিব             জনাব মাহাবুবুল আলম চাষী এবং জনাব আবুল ফতেহ

চ)       প্রতিরক্ষা সচিব           জনাব এম এ সামাদ

ছ)       স্বরাষ্ট্র সচিব               জনাব এ খালেক

জ)      স্বাস্থ্য সচিব                জনাব এস টি হোসেন

ঝ)      তথ্য সচিব                 জনাব আনোয়ারুল হক খান

ঞ)      কৃষি সচিব                জনাব নুরউদ্দিন আহমেদ

ট)       আইন সচিব               জনাব এ হান্নান চৌধুরী 

৩।       কুটনৈতিক দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে যে সমস্ত ব্যক্তিবর্গ মুক্তিযুদ্ধকে বিশ্ববাসীর কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছিলেনঃ

ক)      মিশন প্রধান যুক্তরাজ্য, বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী (বহিঃর্বিশ্বে সরকারের বিশেষ দূত)

খ)       মিশন প্রধান কলিকাতা, জনাব হোসেন আলী

গ)       মিশন প্রধান নতুন দিল্লী, জনাব হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী

ঘ)       মিশন প্রধান যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, জনাব এম আর সিদ্দিকী

ঙ)       মিশন দায়িত্বপ্রাপ্ত ইরাক, জনাব আবু ফতেহ

চ)       মিশন দায়িত্বপ্রাপ্ত সুইজারল্যান্ড, জনাব অলিউর রহমান

ছ)       মিশন দায়িত্বপ্রাপ্ত ফিলিপাইন, জনাব কে কে পন্নী

জ)      মিশন দায়িত্বপ্রাপ্ত নেপাল, জনাব মোস্তাফিজুর রহমান

ঝ)      মিশন দায়িত্বপ্রাপ্ত হংকং, জনাব মহিউদ্দিন আহমেদ

ঞ)      মিশন দায়িত্বপ্রাপ্ত জাপান, জনাব এ রহিম

ট)       মিশন দায়িত্বপ্রাপ্ত লাগোস, জনাব এম এ জায়গীরদার

 

 ৪।       স্বাধীন বাংলাদেশের গণমুখী প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো কিহবে সেই লক্ষ্যে মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশ সরকারের নির্দেশে পরিকল্পনাকমিশন একটি রূপরেখা প্রণয়ন করে। যে সমস্ত উল্লেখযোগ্য ব্যক্তি এইপরিকল্পনায় জড়িত ছিলেন তাঁরা হলেনঃ

 

(ক)     ডঃ মোজাফ্ফর আহমেদ চৌধুরী

(খ)      ডঃ মোশারাফ হোসেন

(গ)      ডঃ খান সরওয়ার মুরশিদ  

(ঘ)      ডঃ এম আনিসুজ্জামান

(ঙ)      ডঃ স্বদেশ বোস।

 

৫।       মুক্ত এলাকায় সুষ্ঠু প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলা এবং ভারতেঅবস্থান গ্রহণকারী শরণার্থীদের দেখাশুনা ও যুব শিবির পরিচালনার জন্য সরকারসমস্ত বাংলাদেশকে ১১টি প্রশাসনিক অঞ্চলে বিভক্ত করেন। প্রতিটি প্রশাসনিকএলাকায় চেয়ারম্যান ও প্রশাসক নিয়োগ করেন।

 

 

১৪.    স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রঃ

 

 

মুক্তিযুদ্ধ সময়কালে যুদ্ধরত মুক্তিযোদ্ধাদের এবং অবরুদ্ধ এলাকার জনগণেরমনোবল অক্ষুন্ন রাখার ক্ষেত্রে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র বিভিন্নঅনুষ্ঠানের মধ্যদিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র থেকে বাংলাদেশ সরকারের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিপরিষদসদস্যদের নীতি নির্ধারণী ভাষণসহ জনগণের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন নির্দেশাবলীপ্রচারিত হয়। প্রতিদিনের সংবাদসহ যে সমস্ত অনুষ্ঠান জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলতার মধ্যে চরমপত্র ও জল্লাদের দরবার অন্যতম। যে সমস্ত ব্যক্তির অক্লান্তপরিশ্রমে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র এই জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল তাঁরাহলেনঃ

 

সর্বজনাব এম এ মান্নান এম এন এ, জিল্লুর রহমান এম এন এ, শওকত ওসমান, ডঃ এআর মল্লিক, ডঃ মযহারুল ইসলাম, ডঃ আনিসুজ্জামান, সিকান্দার আবু জাফর, কল্যাণ মিত্র, ফয়েজ আহমদ, আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী, এম আর আখতার মুকুল, তোয়াবখান, আসাদ চৌধুরী, কামাল লোহানী, আলমগীর কবীর, মহাদেব সাহা, আলী যাকের, সৈয়দ হাসান ইমাম, নির্মলেন্দু গুণ, আবুল কাসেম সন্দ্বীপ, বেলাল মোহাম্মদ, আবদুল জববার, আপেল মাহমুদ, রর্থীন্দ্রনাথ রায়, কাদেরী কিবরিয়া, ডাঃ অরূপরতন চৌধুরী, রফিকুল ইসলাম, সমর দাস, অজিত রায়, রাজু আহামেদ, মামুনুর রশীদ, বেগম মুশতারী শফি, শাহীন মাহমুদ, কল্যাণী ঘোষ, ডালিয়া নওশীন, মিতালীমুখার্জী, বুলবুল মহলানবীশ, শামসুল হুদা চৌধুরী, আশফাকুর রহমান খান, সৈয়দআবদুস সাকেরসহ অনেকে।

১৫.    বাংলাদেশ মুক্তিবাহিনীঃ

যে জনযুদ্ধ এনেছে পতাকা, সেই জনযুদ্ধের দাবিদার এদেশের সাত কোটি বাঙালি।একটি সশস্ত্র যুদ্ধ দেশকে শত্রুমুক্ত করে। এই সশস্ত্র যুদ্ধ একটিনির্বাচিত সরকারের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়। পরিকল্পিত এই যুদ্ধ পরিচালনারজন্য ১০ই এপ্রিল ’৭১ বাংলাদেশ সরকার সমগ্র বাংলাদেশকে ৪টি যুদ্ধঅঞ্চলেবিভক্ত করেন। এই ৪টি অঞ্চলের দায়িত্বপ্রাপ্ত অধিনায়ক ছিলেনঃ

ক)      চট্টগ্রাম অঞ্চল - মেজর জিয়াউর রহমান

খ)       কুমিল্লা অঞ্চল - মেজর খালেদ মোশাররফ

গ)       সিলেট অঞ্চল - মেজর কে এম সফিউল্লাহ

ঘ)       দক্ষিণ পশ্চিম - অঞ্চল মেজর আবু ওসমান চৌধুরী

পরবর্তীতে দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলকে বিভক্ত করে রাজশাহী অঞ্চলে মেজর নাজমুলহক, দিনাজপুর অঞ্চলে মেজর নওয়াজেস উদ্দিন এবং খুলনা অঞ্চলে মেজর জলিলকেদায়িত্ব দেয়া হয়। ৭ই জুলাই ৭১ যুদ্ধের কৌশলগত কারণে সরকার নিয়মিত পদাতিকব্রিগেড গঠনের পরিকল্পনায় ‘জেড ফোর্স’ ব্রিগেড গঠন করেন। এই জেড ফোর্সেরঅধিনায়ক হলেন লেঃ কর্নেল জিয়াউর রহমান। একই ভাবে সেপ্টেম্বর মাসে ‘এসফোর্স’ এবং ১৪ই অক্টোবর ‘কে ফোর্স’ গঠন করা হয়। কে ফোর্সের অধিনায়ক ছিলেনলেঃ কর্নেল খালেদ মোশাররফ এবং এস ফোর্সের অধিনায়ক ছিলেন লেঃ কর্নেল কে. এম.সফিউল্লাহ।

 

১০ই জুলাই ৭১ থেকে ১৭ই জুলাই ৭১ পর্যন্ত মুক্তিবাহিনী সদর দপ্তরেপ্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে যুদ্ধ অঞ্চলের অধিনায়কদের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।এই অধিবেশনে বাংলাদেশকে ১১টি যুদ্ধ সেক্টরে বিভক্ত করে সেক্টর কমান্ডারনিযুক্ত করা হয়। এই কমান্ডারগণ ছিলেনঃ

সেক্টর                  অধিনায়ক যুদ্ধ                                            এলাকা ও তথ্য

সেক্টর-এক         মেজর রফিকুল ইসলাম            চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও নোয়াখালী জেলার ফেনী

মহকুমার অংশ বিশেষ (মুহুরী নদীর পূর্বপাড়পর্যন্ত)। এই সেক্টরের সাব-সেক্টর ছিল পাঁচটি। সেক্টর ট্রুপস্ ছিল ২১০০সৈন্য এবং গেরিলা ছিল ২০,০০০।

সেক্টর-দুই          মেজর খালেদ মোশাররফ           কুমিল্লা জেলার অংশ, ঢাকা জেলা ও ফরিদপুর জেলার 

অংশ এই সেক্টরের সাব-সেক্টর ছিল ছয়টি। সেক্টর ট্রুপস্ ছিল ৪,০০০ সৈন্য এবং গেরিলা ছিল ৩০,০০০।

সেক্টর-তিন         মেজর কে এম শফিউল্লাহ          কুমিল্লা জেলার অংশ, ময়মনসিংহ জেলার অংশ, ঢাকা ও

সিলেট জেলার অংশ।এই সেক্টরের সাব-সেক্টর ছিল সাতটি। সেক্টর ট্রুপস্ ছিল ৬৬৯৩ সৈন্য এবং গেরিলা ছিল ২৫,০০০।

সেক্টর-চার         মেজর সি আর দত্ত                    সিলেট জেলার অংশ।

এই সেক্টরের সাব-সেক্টর ছিল ছয়টি। সেক্টর ট্রুপস্ ছিল ৯৭৫ সৈন্য এবং গেরিলা ছিল ৯,০০০।

সেক্টর-পাঁচ         মেজর মীর শওকত আলী           সিলেট জেলার অংশ ও ময়মনসিংহ জেলার অংশ।

এই সেক্টরের সাব-সেক্টর ছিল ছয়টি। সেক্টর ট্রুপস্ ছিল ১৯৩৬ সৈন্য এবং গেরিলা ছিল ৯,০০০।

সেক্টর-ছয়   উইং কমান্ডার এম খাদেমুল বাশার      রংপুর জেলা ও দিনাজপুর জেলার অংশ।

এই সেক্টরের সাব-সেক্টর ছিল পাঁচটি। সেক্টর ট্রুপস্ ছিল ২৩১০ সৈন্য এবং গেরিলা ছিল ১১,০০০।

সেক্টর-সাত         মেজর নাজমুল হক                  রংপুর জেলার অংশ, রাজশাহী জেলার অংশ, পাবনা জেলার

অংশ ও দিনাজপুর জেলার অংশ, বগুড়া জেলা।

এই সেক্টরের সাব-সেক্টর ছিল নয়টি। সেক্টরট্রুপস্ ছিল ২৩১০ সৈন্য এবং গেরিলা ছিল ১২,৫০০। সেপ্টেম্বর মাসে সড়কদুর্ঘটনায় মেজর নাজমুল হক নিহত হওয়ার পর লেঃ কর্নেল কাজী নুরুজ্জামানসেক্টর অধিনায়কের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

সেক্টর-আট         মেজর আবু ওসমান চৌধুরী        যশোর জেলা, ফরিদপুর জেলা, কুষ্টিয়া জেলা, খুলনা ও

বরিশাল জেলার অংশ।

এই সেক্টরের সাব-সেক্টর ছিল সাতটি। সেক্টরট্রুপস্ ছিল ৩৩১১ সৈন্য এবং গেরিলা ছিল ৮,০০০। ১৮ই আগস্ট লেঃ কর্নেল এমআবুল মঞ্জুর সেক্টর অধিনায়কের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

 

সেক্টর-নয়          মেজর আবদুল জলিল              বরিশাল জেলার অংশ, পটুয়াখালী জেলা, খুলনা, ফরিদপুর

জেলার অংশ।

এই সেক্টরের সাব-সেক্টর ছিল তিনটি। সেক্টর ট্রুপস্ ছিল ৩৩১১ সৈন্য এবং গেরিলা ছিল ৮,০০০।

সেক্টর-দশ          প্রধান সেনাপতির নিয়ন্ত্রণে (নৌ সেক্টর) সমগ্রবাংলাদেশ। এই সেক্টরটি গঠিত হয়েছিল নৌ-কমান্ডোদের দিয়ে। বিভিন্ন নদী বন্দর ওশক্র পক্ষের নৌ-যানগুলোতে অভিযান চালানোর জন্য এঁদের বিভিন্ন সেক্টরেপাঠানো হতো। লক্ষ্যবস্ত্তর গুরুত্ব এবং পাকিস্তানিদের প্রস্ত্ততি বিশ্লেষণকরে অভিযানে সাফল্য নিশ্চিত করার বিষয়টি বিবেচনায় আনা হতো এবং তার ওপরনির্ভর করত অভিযানে অংশগ্রহণকারী দলসমূহে যোদ্ধার সংখ্যা কত হবে। যে সেক্টরএলাকায় কমান্ডো অভিযান চালানো হতো, কমান্ডোরা সেই সেক্টর কমান্ডারের অধীনেকাজ করত। নৌ-অভিযান শেষে তারা আবার তাদের মূল সেক্টর- ১০ নম্বর সেক্টরেরআওতায় চলে আসত। নৌ-কমান্ডোর সংখ্যা ছিল ৫১৫ জন।

সেক্টর এগার     মেজর আবু তাহের।                   ময়মনসিংহ জেলার অংশ, সিলেট জেলার অংশ ও

রংপুর জেলার অংশ। এই সেক্টরের সাব-সেক্টর ছিলসাতটি। সেক্টর ট্রুপস্ ছিল ২৩১০ সৈন্য এবং গেরিলা ছিল ২৫,০০০। মেজর আবুতাহের ১৪ নভেম্বর আহত হওয়ার পর এই সেক্টরের দায়িত্ব কাউকেও দেয়া হয়নি।

১৬.    মুক্তিবাহিনী সদর দপ্তরঃ

 

ক) প্রধান সেনাপতি মুক্তিবাহিনী                   কর্নেল এম এ জি ওসমানী

খ) সেনাবাহিনী প্রধান                                 কর্নেল আবদুর রব

গ) বিমানবাহিনী প্রধান ও উপ-সেনা প্রধান        গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ কে খন্দকার

ঘ) ডাইরেক্টর জেনারেল মেডিকেল সার্ভিসমেজর শামছুল আলম

 পাকিস্তান সেনাবাহিনী ত্যাগ করে মোট ১৩১ জন অফিসার মুক্তিবাহিনীতেযোগদান করেন ও যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেন। ৫৮ জন তরুণ মুক্তিযোদ্ধা ভারতেরমূর্তি অফিসার প্রশিক্ষণ একাডেমী থেকে প্রশিক্ষণ লাভ করে যুদ্ধে যোগদানকরেন। এ কোর্স-কে প্রথম বাংলাদেশ সর্ট সার্ভিস কোর্স বলা হয়। ৬৭ জন তরুণমুক্তিযোদ্ধাকে দ্বিতীয় সর্ট সার্ভিস কোর্সে ভর্তি করা হয় এবং তারা ১৯৭২সনে কমিশন প্রাপ্ত হন। মুক্তিযুদ্ধে ১৩ জন সামরিক অফিসার যুদ্ধ অবস্থায়শাহাদাত বরণ করেন। ৪৩ জন সামরিক অফিসারকে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ২৫ মার্চএবং তার কয়েকদিনের মধ্যে হত্যা করে।

১৭.    মুক্তিযুদ্ধে বিমান বাহিনীঃ

ক।      পাকিস্তান বিমান বাহিনী ত্যাগ করে আসা বাঙ্গালী অফিসার, ক্যাডেটও বিমানসেনারা সেপ্টেম্বর ১৯৭১ পর্যন্ত স্থলযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। মোটপ্রায় ৩৫ জন অফিসার ও ক্যাডেট  এবং প্রায় ৫০০ বিমানসেনা   পাকিস্তান পক্ষত্যাগ করে মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করেন।  এইসব বিমান বাহিনীর সদস্যরা যদিওস্থলযুদ্ধে খুবই বিরোচিত ভুমিকা রাখছিলেন তবুও তাদের মধ্যে একটি স্বাধীনবিমান বাহিনী গঠনের চেতনা খুব প্রবল ভাবে কাজ করছিল। এই চেতনা নিয়েই কিছুসংখ্যক মুক্তিযোদ্ধা পাইলট ভারতীয় বিমান বাহিনী, ভারতীয় সরকার এবং বাংলাদেশফোর্সেস (বিডি এফ) এর সাথে বিভিন্ন রকমের আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছিলেন।

খ।       কিলো ফ্লাইট :    ১৯৭১ এর সেপ্টেম্বর এরমাঝামাঝি ভারত সরকার অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারকে একটি স্বাধীন বিমান বাহিনীগঠনের জন্য আমেরিকায় তৈরী ১টি পুরানো ডিসি-৩ বিমান, কানাডার তৈরী ১টি অটারবিমান এবং ফ্রান্সের তৈরী ১টি এ্যালুয়েট-৩ হেলিকপ্টার দেয়। এর সাথে ভারতেরনাগাল্যান্ডের ডিমাপুরে একটি দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পরিত্যক্ত রানওয়েব্যবহারের অনুমতি দেয়। এই সীমিত সম্পদ নিয়ে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর যাত্রাশুরু হয়।  বিমান বাহিনী প্রধান হিসাবে মুক্তিযুদ্ধের উপ-প্রধান গ্রুপক্যাপ্টেন এ কে খন্দকারকে নিয়োগ দেওয়া হয়।  সশস্ত্র বিমান বাহিনী গঠনে  গোপনীয়তা রক্ষার্থে এর গুপ্ত নাম হয় ‘কিলো ফ্লাইট’। ‘কিলো ফ্লাইটের’ অস্তিত্ব বিডি এফ এবং গোটা কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব ছাড়া আর কেউজানতেন না।  কিলো ফ্লাইটে বিমান বাহিনীর পাইলটদের পাশাপাশি বেশ কয়েকজন পিআই এ  এবং প্লান্ট প্রটেকশনের পাইলট এসে যোগ দেন। বিভিন্ন সেক্টর হতেযুদ্ধরত মোট ৫৮ জন বিমানসেনাকে এই ফ্লাইটে নিয়ে আসা হয়। এই ফ্লাইটেরনেতৃত্বের দায়িত্ব দেয়া হয় স্কোঃ লীঃ সুলতান মাহমুদকে।  এই সব অত্যুৎসাহীবিমান বাহিনী সদস্যদের সমন্বয়ে  ১৯৭১ এর ২৮ সেপ্টেম্বর সশস্ত্র বাংলাদেশবিমান বাহিনীর  উদ্ধোধন  হয়।  শুরু হয় কঠোর প্রশিক্ষণ। এই ফ্লাইট, ঢাকা, চট্টগ্রাম, লালমনিরহাট এলাকায় মোট ৫০টি অভিযান সাফল্যের সঙ্গে পরিচালনাকরে। এদের মধ্যে মোগলহাটে (১৫ অক্টোবর ৭১), লালমনিরহাট ও ঠাকুরগাঁয়ে (১৬অক্টোবর ৭১), চৌগাছায় (২১ নভেম্বর ৭১), গোদনাইল ও পতেঙ্গায় (৩ ডিসেম্বর৭১), সিলেটে (৪ ডিসেম্বর ৭১), জামালপুরে (৫ ডিসেম্বর ৭১),  মেঘনা নদীতে (৬ডিসেম্বর ৭১), সিলেটে (৭ ডিসেম্বর ৭১) এবং নরসিংদীতে  (১১ ডিসেম্বর ৭১)বিমান হামলা বিশেষ উল্লেখযোগ্য।

১৮.    মুক্তিযুদ্ধে নৌ-বাহিনীঃ

মহান মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশ নৌ বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ ও গৌরবময় ভূমিকারয়েছে। ১৯৭১ সালে পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে মহান স্বাধীনতাসংগ্রামের সময় বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর অধীনে বাংলাদেশ নৌ বাহিনীর জন্মহয়। ১৯৭১ সালের জুলাই মাসে ঐতিহাসিক সেক্টর কমান্ডারদের কনফারেন্সের ঘোষণামোতাবেক বাংলাদেশ নৌ বাহিনী আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করে। উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বাঙ্গালী অফিসার ও নাবিকগণ পশ্চিম পাকিস্তান ত্যাগ করে দেশে এসেবাংলাদেশ নৌ বাহিনী গঠন করেন। ভারত থেকে প্রাপ্ত ‘পদ্মা’ ও ‘পলাশ’ নামেরছোট দুটি গানবোট এবং ৪৯ জন নাবিক নিয়ে যাত্রা শুরু করে বাংলাদেশ নৌ বাহিনী।জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এ সমস্ত নাবিকগণ শত্রুর বিরুদ্ধে সম্মুখ যুদ্ধ ও গেরিলাযুদ্ধে লিপ্ত হন। পাশাপাশি ‘ অপারেশন জ্যাকপট’ নামে নির্ভীক ডুবুরীদলসমুদ্র ও নদী বন্দর সমূহে বিধংসী আক্রমণ পরিচালনা করেন। এতে হানাদারবাহিনীর ২৬ টি জাহাজ ধ্বংস হয় ও সমুদ্র পথ কার্যতঃ অচল হয়ে পড়ে। নৌ বাহিনীরঅপারেশনের মধ্যে হিরণ পয়েন্টের মাইন আক্রমণ (১০ নভেম্বর ৭১), মার্কিন ওব্রিটিশ নৌযান ধ্বংস (১২ নভেম্বর ৭১), চালনা বন্দরে নৌ হামলা (২২ নভেম্বর৭১), চট্টগ্রাম নৌ অভিযান (০৫ ডিসেম্বর ৭১), পাকিস্তান নৌ ঘাঁটি পিএনএসতিতুমীর অভিযান (১০ ডিসেম্বর ৭১) উল্লেখযোগ্য। মহান মুক্তিযুদ্ধে নৌবাহিনীর দুঃসাহসিক অভিযানে শক্রপক্ষ নৌ পথে দিশেহারা হয়ে পড়ে। মহানমুক্তিযুদ্ধে বহুসংখ্যক নৌ সদস্য শাহাদৎবরণ করেন। তাঁদের বীরত্ব ওআত্নত্যাগের স্বীকৃতি স্বরূপ শহীদ রুহুল আমিন, ইআরএ-১, কে বীরশ্রেষ্ঠ খেতাবপ্রদান করা হয়। এছাড়া ০৫ জনকে বীর উত্তম, ০৮ জনকে বীর বিক্রম এবং ০৭ জনকেবীর প্রতীক খেতাবে ভূষিত করা হয়। জাতি মহান মুক্তিযুদ্ধে নৌ বাহিনীরভূমিকাকে গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে।

১৯.    ব্রিগেড সংগঠন ও অপারেশনঃ

মুক্তিযুদ্ধের প্রথম দিকটা ছিল গেরিলাভিত্তিক কিন্তু এভাবে গেরিলা যুদ্ধপাকিস্তানি বাহিনীর সুশিক্ষিত সৈন্যদের পদানত করার ক্ষেত্রে যথেষ্ট ভূমিকারাখতে পারছিল না। ফলে যুদ্ধ ক্ষেত্রে গতিশীলতা আনয়ন ও মুক্তাঞ্চল গঠনেরলক্ষ্যে সেনাবাহিনীর গঠন বিন্যাসের পরিবর্তন আনার পরিকল্পনা গৃহীত হয়।  এপ্রিল মাসে মুজিবনগর সরকার গঠিত হলে প্রধান সেনাপতি কর্নেল এম এ জি ওসমানীসেনাবাহিনীর  সদস্যদের নিয়ে নিয়মিত ব্রিগেড গঠনের পরিকল্পনা গ্রহণ করেন।সম্মুখ সমরের পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সংগে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার জন্য তিনটিনিয়মিত ব্রিগেড গঠন করা হয়। এরা হচ্ছেঃ

ক) জেড ফোর্স-লেঃ কর্নেল জিয়াউর রহমানের নামানুসারেজুলাই ৭১ সনের ৭ই জুলাই গঠিত হয় এই বিগ্রেড যার নাম করা হয় জেড ফোর্স। এইফোর্সের অন্তর্ভূক্ত ছিল ১ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট, ৩ ইস্ট বেঙ্গলরেজিমেন্ট, ৮ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট, ২ ফিল্ড ব্যাটারি আর্টিলারি ও একটিসিগন্যাল কোম্পানী। জুলাই ৭১ থেকে সেপ্টেম্বর ৭১ পর্যন্ত জেড ফোর্সময়মনসিংহ, জামালপুর, শেরপুর ও রৌমারী এলাকায় যুদ্ধরত থাকে। অক্টোবর থেকেচূড়ান্ত বিজয় পর্যন্ত তারা সিলেট, সুনামগঞ্জ ও মৌলভীবাজার এলাকায় যুদ্ধেঅংশ গ্রহণ করে। জেড ফোর্সের উল্লেখযোগ্য যুদ্ধ সমূহ ছিল কামালপুর যুদ্ধ, বাহাদুরাবাদ ঘাট অপারেশন, দেওয়ানগঞ্জ থানা আক্রমণ, নকসী বিওপি আক্রমন, চিলমারীর যুদ্ধ, হাজীপাড়ার যুদ্ধ, ছোটখাল, গোয়াইনঘাট, টেংরাটিলা, গোবিন্দগঞ্জ, লামাকাজি, সালুটিকর বিমানবন্দর, ধলই, ধামাই চা বাগান, জকিগঞ্জ, আলি  ময়দান, সিলেট এমসি কলেজ, ভানুগাছা, কানাইঘাট, ফুলতলা চাবাগান, বড়লেখা, লাতু, সাগরনাল চা বাগান, ছাতক ও রাধানগর।

খ) কে ফোর্স-লেঃ কর্নেল খালেদ মোশাররফের নামানুসারেসেপ্টেম্বর ৭১ সনে গঠিত হয় এই বিগ্রেড যার নাম করা হয় কে ফোর্স। এই ফোর্সেরঅন্তর্ভূক্ত ছিল ৪ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট, ৯ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট, ১০ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট, ১ ফিল্ড ব্যাটারি (মুজিব ব্যাটারী) আর্টিলারি ওএকটি সিগন্যাল কোম্পানী। কে ফোর্সের উল্লেখযোগ্য যুদ্ধ সমূহ ছিল দেউশমন্দভাগ অভিযান, শালদা নদী অভিযান, পরশুরাম, চিতলিয়া, ফুলগাজী, নিলক্ষ্মীরযুদ্ধ, বিলোনিয়ার যুদ্ধ, চাপিলতার যুদ্ধ, কুমিল্লা শহরের যুদ্ধ, নোয়াখালীরযুদ্ধ, কশবার যুদ্ধ, বারচরগ্রাম যুদ্ধ, মিয়াবাজার যুদ্ধ, গাজীপুর যুদ্ধ, সলিয়াদীঘি যুদ্ধ, ফেনী যুদ্ধ, চট্টগ্রাম বিজয় ও ময়নামতি বিজয়।

গ) এস ফোর্স-লেঃ কর্নেল কে এম সফিউল্লাহর নামানুসারেঅক্টোম্বর ৭১ সনে গঠিত হয় এই বিগ্রেড যার নাম করা হয় এস ফোর্স। এই ফোর্সেরঅন্তর্ভূক্ত ছিল ২ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট, ১১ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট, এসফোর্সের উল্লেখযোগ্য যুদ্ধ সমূহ ছিল ধর্মগড় আক্রমন, মনোহরদী অবরোধ, কলাছড়াঅপারেশন, বামুটিয়া অপারেশন, আশুগঞ্জ অপারেশন, মুকুন্দপুর যুদ্ধ, আখাউড়াযুদ্ধ, ব্রাহ্মণবাড়ীয় যুদ্ধ, ভৈরব ও আশুগঞ্জ যু্দ্ধ, কিশোরগঞ্জ যুদ্ধ, হরশপুর যু্দ্ধ, নরসিংদী যুদ্ধ ও বিলোনিয়ার যুদ্ধ।

২০.    বি এল এফ (মুজিব বাহিনী)ঃ

বিশাল এই জনযুদ্ধে ছাত্র ও যুবক শ্রেণী উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে।স্বাধীনতা আন্দোলনের পটভুমিতে ছাত্র আন্দোলনের অবস্থান ছিল অত্যন্ত দৃঢ়। ৬০দশকের মাঝামাঝি এই ছাত্র সংগঠনের নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে একটিদীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধের পরিকল্পনায় সংগঠিত হয়ে রাজনৈতিক মতাদর্শের ছাত্রদেরসশস্ত্র যুদ্ধের প্রস্ত্ততি সমন্বিত করে। নেতৃস্থানীয় প্রায় ১০,০০০ (দশহাজার) ছাত্রকে এই বিশেষ প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। সমগ্র বাংলাদেশকে ৪টি রাজনৈতিকযুদ্ধ অঞ্চলে বিভক্ত করে এই সমস্ত ছাত্রদেরকে নিজ নিজ এলাকার ভিত্তিতেঅবস্থান নেয়ার জন্য প্রেরণ করা হয়।

 এই ৪টি অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণকারী নেতৃবৃন্দ ছিলঃ

ক) পূর্ব অঞ্চল                      জনাব শেখ ফজলুল হক মনি ও জনাব আ স ম আবদুর রব

খ) উত্তর অঞ্চল                     জনাব সিরাজুল আলম খান ও জনাব মনিরুল ইসলাম

গ) পশ্চিম অঞ্চল                   জনাব আবদুর রাজ্জাক ও জনাব সৈয়দ আহমদ

ঘ) দক্ষিণ অঞ্চল                    জনাব তোফায়েল আহমদ ও জনাব কাজী আরেফ আহমেদ

প্রশিক্ষণ শিবিরে কর্মরত ছিলেনঃ জনাব নূরে আলম জিকু, হাসানুল হক ইনু, শরীফ নূরুল আম্বিয়া, আফম মাহবুবুল হক ও মাসুদ আহমেদ রুমীসহ অনেকে। বাংলাদেশকমুনিষ্ট পার্টির তত্ত্বাবধানে ছাত্র সংগঠন সংগঠিত হয়। এই সশস্ত্র যুবশ্রেণীকে নেতৃত্ব দেন জনাব হারুনুর রশীদ, নূরুল ইসলাম নাহিদ, মুজাহিদুলইসলাম সেলিমসহ অনেকে। এ ছাড়াও জনাব কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বে এলাকা ভিত্তিকগড়ে ওঠা টাংগাইল মুক্তি বাহিনীর নাম উল্লেখ্যযোগ্য।

২১.    স্বাধীন বাংলা বেতারঃ

স্বাধীন বাংলা বেতারের সূচনা হয় চট্টগ্রামের কালুরঘাটে ট্রান্সমিশন ভবনে২৬ মার্চ ১৯৭১ সনে। ৩০ মার্চ ১৯৭১ পাকিস্তান বিমান বাহিনী আক্রমণে তাধ্বংস করা হয়। এর পর কিছু দিন আগরতলাতে এবং তারপর ২৫ মে ১৯৭১ কলকাতা থেকেসম্প্রচার নিয়মিত শুরু করা হয়। মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীন বাংলা বেতার বিশালঅবদান রাখে। চরম পত্র, রণাংগন কথিকা, রক্ত স্বাক্ষর, মুক্তিবাহিনীর জন্যপ্রচারিত অনুষ্ঠান অগ্নিশিক্ষা, দেশাত্ত্ববোধক গান ইত্যাদি মুক্তিযোদ্ধা ওবাংলাদেশের মানুষকে উজ্জীবিত করেছিল।

২২. গণমাধ্যমঃ

স্বাধীনতার স্বপক্ষে বাংলাদেশ ও বিদেশে বাঙ্গালীদের উদ্দোগ্যে মুজিবনগর, মার্কিন যুক্তরাজ্য, কানাডাসহ বিভিন্ন দেশে সংবাদপত্র প্রকাশ করা। এই সবসংবাদপত্রে মুক্তিবাহিনীর তৎপরতা, বাংলাদেশ সরকারের কার্যক্রম ওনির্দেশাবলী, নেত্রবৃন্দের বিবৃতি ও তৎপরতা, প্রবাসী বাঙ্গালীদের আন্দোলনেরখবর ইত্যাদি প্রকাশিত হত। এদের মধ্যে মুজিবনগর থেকে প্রকাশিত জয় বাংলা, বাংলাদেশ, বঙ্গবাণী, স্বদেশ, রণাঙ্গন, স্বাধীন বাংলা, মুক্তিযুদ্ধ, সোনারবাংলা, বিপ্লবী বাংলাদেশ, জন্মভূমি, বাংলারবাণী, নতুন বাংলা ইত্যাদিউল্লেখযোগ্য।  এছাড়া মার্কিন যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত বাংলাদেশ নিউজলেটার, বাংলাদেশ সংবাদ পরিক্রমা, আমেরিকা থেকে প্রকাশিত বাংলাদেশ নিউজলেটার, বাংলাদেশ নিউজ বুলেটিন, শিক্ষা উল্লেখযোগ্য। কানাডা থেকে বাংলাদেশস্ফুলিঙ্গ নামক সংবাদপত্র প্রকাশিত হত।

২৩.    পাকিস্তানী দখলদার বাহিনী ও তার সহযোগীরাঃ

২৬ শে মার্চ ’৭১ বাংলাদেশ একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসাবেপ্রতিষ্ঠিত হয়। যার ফলে ২৬শে মার্চ এর পর বাংলাদেশে অবস্থিত পাকিস্তানসেনাবাহিনী একটি দখলদার বাহিনীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। দেশকে শত্রুমুক্ত করারলক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকার এক সশস্ত্র যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। সমগ্র জাতিকেএকত্রিত করে বিদেশী বন্ধু ও সহযোগী রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতায়১৬ ডিসেম্বর ’৭১ বাংলাদেশ শত্রুমুক্ত হয়।

বাংলাদেশকে শত্রুমুক্ত করার এই সশস্ত্র অধ্যায়ে উল্লেখযোগ্য কিছুরাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবী, সামরিক বেসামরিক কর্মকর্তা, ছাত্র ও যুব সংগঠনেরনেতৃবৃন্দ পাকিস্তান দখলদার বাহিনীর সহযোগী হয়ে মুক্তিকামী মানুষের উপরজঘন্য এবং পৈশাচিক অত্যাচার ও হত্যাকান্ড চালায়। এই নির্মম ও নিষ্ঠুরঅত্যাচারে শহীদ হয় ৩০ লক্ষ নিরীহ নিরাপরাধ শিশু-কিশোরসহ সর্বস্তরের মানুষ।শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হয় ২ লক্ষ ৫০ হাজারের অধিক বাংলার নারী। দেশ ছাড়তেবাধ্য হয় প্রায় এক কোটি মানুষ। সকলের একটি মাত্র অপরাধ ‘‘তারা ছিলবাঙালি’’। পাকিস্তানের সামরিক শাসকের দাম্ভিক উক্তি ‘‘ আমি মানুষ চাইনা-পূর্ব বাংলার মাটি চাই’’। এই পোড়া মাটির নীতিকে সমর্থন দিয়ে বিভিন্নব্যক্তি বা সংগঠন এগিয়ে আসে।

২৪.    শান্তি কমিটিঃ

৪ঠা এপ্রিল ’৭১ জনাব নুরুল আমিনের নেতৃত্বে অধ্যাপক গোলাম আযম ও খাজাখয়েরউদ্দীন টিক্কা খানের সাথে সাক্ষাৎকরে সর্বপ্রকার রাজনৈতিক সহযোগিতারআশ্বাস প্রদান করেন এবং ‘‘নাগরিক কমিটি’’ গঠনের প্রস্তাব পেশ করেন। ৬ইএপ্রিল ’৭১ অধ্যাপক গোলাম আযম ও হামিদুল হক চৌধুরী টিক্কা খানের সাথেসাক্ষাৎকরে  ‘‘নাগরিক শান্তি কমিটি’’ গঠনের প্রস্তাব দেন। ৯ই এপ্রিল ’৭১ঢাকায় ১৪০ সদস্য নিয়ে ‘‘নাগরিক শান্তি কমিটি’’ গঠিত হয়। ১৭ই এপ্রিল ’৭১ এইকমিটির নাম পরিবর্তন করে ‘‘শান্তি কমিটি’’ রাখা হয় এবং জেলা ও মহকুমাপর্যায়ে এই কমিটি গঠিত হয়। রাজাকার নির্বাচন, নিয়োগ ও নিয়ন্ত্রণ এই কমিটিরঅন্যতম দায়িত্ব ছিল।

২৫. রাজাকার বাহিনীঃ

মে ’৭১ মওলানা এ কে এম ইউসুফের নেতৃত্বে ৯৬ জন জামায়াত কর্মী নিয়েখুলনার আনসার ক্যাম্পে এই বাহিনী গঠিত হয়। তিনি এই বাহিনীর নামকরণ করেন‘‘রাজাকার বাহিনী’’। এই বাহিনীর মোট সদস্য সংখ্যা ছিল ৫০,০০০ (পঞ্চাশ)হাজার। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রধান সহযোগী হিসাবে এই বাহিনী দায়িত্ব পালনকরে। বিশেষ করে গ্রাম অঞ্চলে এই বাহিনীর অত্যাচারের চিহ্ন আজো বিদ্যমান।

২৬. আলবদর বাহিনীঃ

১৯৭১ এর আগস্ট মাসে ময়মনসিংহে এই বাহিনী গঠিত হয়। সম্পূর্ণ ধর্মীয়আদর্শের উপর ভিত্তি করে এই বাহিনীর গঠন ও কার্যক্রম পরিচালিত হয়। বাঙালিজাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী বিশেষ ব্যক্তিবর্গের বিরুদ্ধে এই বাহিনীকে ব্যবহারকরা হয়। এই বাহিনীর কার্যকলাপের মধ্যে বুদ্ধিজীবী হত্যাকান্ড অন্যতম।মিরপুর বধ্যভূমি এই বাহিনীর হত্যাযজ্ঞের সাক্ষ্য বহন করে।

২৭. শরণার্থীঃ

পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর বর্বরচিত আক্রমণ ও নির্যাতনের শিকার হয়ে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশী ভারতে গমন করেন। ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকায় ১৪১টিশরণার্থী শিবির স্থাপিত করা হয়। এই শিবিরগুলিকে মোট ৯,৮৯৯,৩০৫ বাংলাদেশীআশ্রয় গ্রহণ করেন। পশ্চিম বঙ্গে ৭,৪৯৩,৪৭৪, ত্রিপুরাতে ১,৪১৬,৪৯১, মেঘালয়ে৬৬৭,৯৮৬, আসামে ৩১২,৭১৩ ও বিহারে ৮৬৪১ সংখ্যক বাংলাদেশী শরণার্থী আশ্রয়গ্রহণ করেন।

 

২৭. বিজয়ের পরিকল্পনা- সম্মিলিত চুড়ান্ত আক্রমণঃ

অক্টোবর ’৭১ মাসের মধ্যে পাকিস্তান সেনাবাহিনী মুক্তিবাহিনীর আক্রমণেবিপর্যস্ত হয়ে সমস্ত সীমান্ত এলাকা ছেড়ে দিয়ে সেনানিবাস অথবা বড় বড় শহরভিত্তিক অবস্থান নিতে বাধ্য হয়। এই সময়ের মধ্যে মুক্তিবাহিনী বাংলাদেশেরপ্রায় ৮০ ভাগ এলাকা মুক্ত করেছিল। নভেম্বর ’৭১ এর প্রথম দিকে মুক্তিবাহিনী ওভারতীয় মিত্র বাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত হয় সম্মিলিত বাহিনী। এই পর্যায়েবাংলাদেশের সমগ্র যুদ্ধ এলাকাকে ৪ ভাগে বিভক্ত করে এই যৌথ কমান্ডেরনেতৃত্বে সমস্ত সৈন্যবাহিনীকে সমন্বিত করে যুদ্ধ পরিকল্পনা গড়ে তোলা হয়।৩রা ডিসেম্বর ’৭১ পাকিস্তান অতর্কিতভাবে ভারত আক্রমণ করলে যুদ্ধের মোড়পরিবর্তিত হয়। ৬ই ডিসেম্বর ’৭১ ভারত স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশকে স্বীকৃতিদিলে মুক্তিবাহিনীর মনোবল বহুলাংশে বৃদ্ধি পায়। এই পর্যায়ে সমন্বিত একযুদ্ধ পরিকল্পনায় সম্মিলিত বাহিনী প্রচন্ড বেগে অগ্রসর হয়ে পাকিস্তানসেনাবাহিনীকে পর্যুদস্ত করে।

এই চূড়ান্ত যুদ্ধে ভারতীয় ইষ্টার্ণ কমান্ড অংশ গ্রহণ করে। তাদের সদরদপ্তর ছিল কলকাতাস্থ ফোর্ট উইলিয়ামে এবং অধিনায়ক ছিলেন লেঃ জেনারেল জগজিতসিং অরোরা। এই যুদ্ধে ভারতীয়দের তিনটি কোর (৭ টি ডিভিশন), একটি কমুইনিকেশনজোন, একটি প্যারা বিগ্রেড, ৩টি বিগ্রেড গ্রুপ, ১২টি মিডিয়াম রেজিমেন্টআর্টিলারী, ৪৮ টি ফিল্ড রেজিমেন্ট আর্টিলারী, ১টি আরমার্ড রেজিমেন্ট, ২টিইন্ডিপেন্ডেন্ট আরমার্ড বিগ্রেড, ৩টি ইঞ্জিনিয়ার বিগ্রেড, ২৯ টি বিএসএফব্যাটালিয়ান অংশ গ্রহণ করেন। এই যুদ্ধে ভারতীয়দের শহীদদের সংখ্যা ৬৯ জনঅফিসার, ৬০ জন জেসিও ৩ জন এনসিও ও ১২৯০ জন সৈনিক। আহত হন ২১১ জন অফিসার, ১৬০ জন জেসিও, ১১ জন এনসিও এবং ৩৬৭৬ সৈনিক। এছাড়াও যুদ্ধে মিসিং হন ৩ জনজেসিও ও ৫৩ জন সৈনিক।

১৪ ডিসেম্বর বাংলাদেশের বহু বুদ্ধিজীবিদের পাকিস্তানসেনাবাহিনী ও তাদের দোসররা পরিকল্পিত ভাবে হত্যা করে। ১৬ই ডিসেম্বর ’৭১বিকাল ৪টা ৩০ মিনিটে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহ্রাওয়ার্দী উদ্যান)পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর ৯৩ হাজার সৈন্য বিনা শর্তে সম্মিলিত বাহিনীরকাছে আত্মসমর্পণ করে। এই আত্মসমর্পণ দলিলে স্বাক্ষর করেন পূর্বাঞ্চলেরসম্মিলিত বাহিনী প্রধান লেঃ জেনারেল জগজিত সিং অরোরা ও পাকিস্তানসেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় অধিনায়ক লেঃ জেঃ এ কে নিয়াজী। এই আত্মসমর্পণঅনুষ্ঠানে বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধিত্ব করেন মুক্তিবাহিনীর উপ-সেনাপ্রধান ও বিমান বাহিনী প্রধান গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ কে খন্দকার। এই অনুষ্ঠানেমুক্তিবাহিনীর নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের মধ্যে আরও উপস্থিত ছিলেন এস ফোর্সঅধিনায়ক লেঃ কর্নেল কে এম সফিউল্লাহ, ২নং সেক্টরের ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক মেজরএ টি এম হায়দার এবং টাঙ্গাইল মুক্তি বাহিনীর অধিনায়ক জনাব কাদের সিদ্দিকী।১৬ ডিসেম্বর ’৭১ বাংলাদেশ শত্রুমুক্ত হয়। প্রতি বছর এই দিনটি ‘‘বিজয়দিবস’’ হিসাবে পালিত হয়।

মুক্তিযুদ্ধে রংপুর

বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাস আছে। ১৯৪৭ এরভারত- পাকিস্তান বিভক্তের পর থেকেই পূর্ব পাকিস্তান তথা বর্তমান বাংলাদেশেররাজনৈতিক অবস্থা ক্রমে সংক্ষুব্ধ হয়ে উঠে। এই সংক্ষুব্ধ হওয়ার পর্যায়টিভাষা আন্দেলনের ক্ষেত্রে প্রথম রুপ লাভ করে। কারণ উর্দু ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার সিদ্ধান্তকে এদেশের মানুষ মেনে নেয়নি। ফলে শুরু হয় বিক্ষোভআন্দোলন। অবশেষে ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি সৃষ্টি হয় রক্তক্ষয়ী ইতিহাস।রংপুরের জনগণও এই ভাষা আন্দোলনে মিছিল শোভাযাত্রায় স্বতঃস্ফূর্তভাবেঅংশগ্রহণ করে। পরবর্তীতেকালে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর শোষণ বৈষম্য এসব কিছুরবিরুদ্ধে সারাদেশে আন্দোলন দানা বেঁধে উঠে। এক্ষেত্রে রংপুর পিছিয়েথাকেনি। ১৯৭০ সালে নির্বাচনের পর পাকিস্তান সরকার ক্ষমতা হস্তান্তর করেনি।ফলে ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকায়বিশাল জনসভায় ঘোষণা করেন ‘‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রামস্বাধীনতার সংগ্রাম’’। এরপর ২৫ মার্চ এর ভয়াল কাল রাত্রির পর শুরু হয়মুক্তিযুদ্ধ। রংপুরও এই মহান মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে একাত্ম হয়ে উঠে।

ভোমরাদহ ইউনিয়ন ঠাকুরগাঁও জেলাঃ-

স্বাধীনতাকামী রংপুরের মানুষ ৩ মার্চ প্রথম যুদ্ধ আরম্ভ করে। মহানস্বাধীনতা যুদ্ধের প্রথম শহীদ রংপুরের শংকু সমজদার। ৩ মার্চে রংপুরে ৩ জনপ্রাণ হারিয়েছে এবং এদের প্রাণদানের মাধ্যমে শুরু হয় রংপুরের মুক্তিযুদ্ধ।মুক্তিযুদ্ধে রংপুরের সকল শ্রেণীর মানুষ অংশ গ্রহণ করেন। ৩ মার্চ থেকে ৫মার্চ রংপুরে কারফিউ চলে। এ অঞ্চলের মানুষ সশস্ত্র যুদ্ধ আরম্ভ করে ২৪মার্চ। ২৮ মার্চ রোববার রংপুরের মানুষ জেগে উঠেছিল এক নবচেতনায়। স্বাধীনতাচেতনায় উদ্বুদ্ধ মানুষ রংপুরের বিভিন্ন অঞ্চল হতে লাঠিসোটা, তীর ধনুক, বল্লম ইত্যাদি সহযোগে রংপুর ক্যান্টমেন্ট আক্রমণ করে বেলা ৩.০০ টার দিকে।স্বাধীনতার চেতনায় উদ্বুদ্ধ রংপুরের মানুষ বিভিন্ন অঞ্চল হতে লাঠিশোঠা, তীরধনুক, বল্লম,দা,কুড়াল ইত্যাদি সহযোগে রংপুর ক্যান্টনমেন্ট আক্রমন করে বেলা৩.০০ ঘটিকার দিকে। এতে ক্যান্টমেন্টের পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সৈন্যরা এসমস্ত বিক্ষুব্ধ জনতার উপর ঝাপিয়ে পরে এবং অসংখ্য মানুষকে নির্মমভাবে হত্যাকরে। রংপুরের অগনিত মানুষ প্রাণ দিয়ে সৃষ্টি করে এক অবিস্বরণীয় ঘটনা। ৩এপ্রিল মধ্যরাতে রংপুরের প্রথম গণহত্যা ঘটে দখিগঞ্জ হত্যাকান্ডের মাধ্যমে।এরপর ক্রমান্বয়ে বলারখাইল গণহত্যা, ঝাড়ুদার বিল ও পদ্মপুকুরের গণহত্যা, জয়রাম আনোয়ার মৌজার গণহত্যা, সাহেবগঞ্জের গণহত্যা, লাহিড়ীরহাটের গণহত্যা, ঘাঘটপাড়ের গণহত্যা, নিসবেতগঞ্জ গণহত্যা, দমদমা ব্রীজ গণহত্যা, জাফরগঞ্জগণহত্যা প্রভৃতি নৃশংস হত্যাকান্ডে রংপুরবাসী তাদের প্রিয়জনকে হারায়।পাকিস্তান হানাদার বাহিনী বুদ্ধিজীবী হত্যার নীলকসা অনুযায়ী৩০শে এপ্রিল১৯৭১ রংপুর কারমাইকেল কলেজ ক্যাম্পাসে অবস্থারত (অধ্যাপক চিত্ত রঞ্জন, অধ্যাপক রাম কৃষ্ণ অধিকারী ও অধ্যাপক সুনীল চক্রবর্তী) অধ্যাপকগণকে রাতেরঅন্ধকারে নির্মমভাবে হত্যাকরে দমদমা ব্রিজের পার্শ্বে এক বাঁশঝাড়ে গণ কবরদেয়। এছাড়াও অধ্যাপক কালাচাদ রায় ও তার স্ত্রীকে হত্যা করা হয় এবং এইধারাবাহিকতায় হত্যা করা হয় অধ্যাপক আব্দুর রহমান ও অধ্যাপক সোলায়মানকে। এসময় হানাদার বাহিনীর নির্যাতনের কেন্দ্রস্থল ছিল রংপুর টাউন হল।

 

সময়ের সাথে সাথে মুক্তিযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে সমগ্র রংপুরে। ১২ ডিসেমবর রংপুরসেনানিবাস ছাড়া সমগ্র রংপুর মুক্তিবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। ১৩ ডিসেমবরগংগাচড়া থানায় সর্বপ্রথম ২১২ জন রাজাকার আত্মসমর্পণ করে। ১৫ ডিসেমবর তিস্তাব্রীজে হানাদার বাহিনীর সাথে মুক্তিবাহিনীর তুমুল যুদ্ধ হয়। ১৬ ডিসেমবরওরংপুর শহর ও শহরতলীতে লড়াই চলতে থাকে। ১৭ ডিসেমবর পাকিস্তানি হানাদারবাহিনী যৌথবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করার মধ্য দিয়ে সম্পূর্ণ শত্রুমুক্ত হয়বৃহত্তর রংপুর অঞ্চল। নয়মাস অবরুদ্ধ মানুষ খুঁজে পায় মুক্তির আস্বাদন। বীরমুক্তিযোদ্ধাদের অকুতোভয় দেশপ্রেম আর অগণিত মানুষের আত্মত্যাগের বিনিময়েরংপুরে উদিত হয় স্বাধীনতার রক্তিম লাল সূর্য।

সুত্র: রংপুর বিভাগ

ঠাকুরগাঁও-এ মুক্তিযুদ্ধ

৭ মার্চ, ১৯৭১। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার ঐতিহাসিক ভাষণদেন। স্বাধীনতার পক্ষে ৯ মার্চ পল্টন ময়দানে ভাষণ দেন মওলানা আব্দুল হামিদখান ভাসানী। ঠাকুরগাঁওয়ের মানুষও ঢাকার সংবাদের সাথে একাত্মতা ঘোষণাকরেছিলো। তখন ঢাকা থেকে প্রকাশিত সংবাদপত্র এখানে পৌঁছতো পরের দিন। প্রাপ্ততথ্য ও সংবাদের ভিত্তিতে ঠাকুরগাঁও শহরের জনসমাবেশ, মিছিল-মিটিং তথাসার্বিক আন্দোলন আস্তে আস্তে দানা বেঁধে উঠছিলো। আওয়ামীলীগ, ন্যাপ ওকমিউনিস্ট পার্টি এবং তাদের অঙ্গসংগঠনগুলোর ডাকে আহুত কর্মসূচীতে সাড়া দিয়েপথে নেমেছিলো ছাত্র-জনতা-কৃষক-শ্রমিক। কাড়িবাড়ি হাটের দক্ষিনে ওয়াপদাআবাসিক এলাকা থেকে উত্তরে টাঙ্গনের পাড়ের রিভারভিউ হাইস্কুল, পশ্চিমেঠাকুরগাঁও কলেজ থেকে পূর্বে বাসষ্ট্যান্ড পর্যন্ত প্রায় ৬ বর্গকিলোমিটারআয়তনের ছোট সাজানো গোছানো শহরটা টগবগিয়ে ফুটছিলো জনতার উত্তাল শ্লোগান আরমিছিলে। সকালের নাস্তা খেয়েই মানুষ এসে জড়ো হতো চৌরাস্তায়। নেতৃস্থানীয়রাবসতেন পেল্টু বাবুর চায়ের দোকানে।

৩ মার্চবিকেলে স্থানীয় ফুটবল মাঠে তৎকালীন মহকুমা আওয়ামীলীগের সভাপতি আব্দুল লতিফমোক্তারের সভাপতিত্বে জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে মহকুমার তৎকালীন ১০ টি থানারবিভিন্ন পেশা ও রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দসহ শহরের বেশিরভাগ মানুষ উপস্থিতছিলেন।

রাতেবিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ ও ছাত্র সংগঠনের নেতৃবৃন্দফজলুল করিম এমপিএ সাহেবের বাসায় মিলিত হন। এখানে ৭১ সদস্য বিশিষ্ট একটি‘‘সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ’’ গঠন করা হয়। সংগ্রাম পরিষদের কার্যাবলী সমন্বয় ওগণজাগরণ সৃষ্টির লক্ষ্যে ৩টি উপ কমিটি গঠন করা হয় যার একটি ছিল প্রতিবেশীদেশ ভারতের নেতৃবৃন্দের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে প্রয়োজনীয় মুহূর্তে যেনসহায়তা পাওয়া যায়। এই উপ কমিটির দায়িত্বে ছিলেন এ্যাডভোকেট বলরামগুহঠাকুরতা এবং আব্দুর রশীদ মোক্তার।

৪ মার্চতারিখের মিছিলে স্থানীয় মহিলাদের অংশগ্রহণ ছিল বেশ স্বত:স্ফুর্ত যা পরবর্তীসময়ের আন্দোলনকে তরান্বিত করেছিলো। এদিন ফুটবল মাঠে সভা অনুষ্ঠিত হয়।এখানে প্রতি থানা থেকে ৩০০ জন নেতাকর্মীকে ৭ মার্চের রেসকোর্সের জনসভায়যোগদানের জন্য পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ৫ মার্চ চৌরাস্তা ও পাবলিকলাইব্রেরী মাঠে গণমজায়েতের পর রেলপথে বিভিন্ন সংগঠন ও রাজনৈতিক দলের প্রায়৫০০ নেতাকর্মী ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন।

৭ মার্চতারিখের বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমান ঐতিহাসিক ভাষণের পরিপূর্ণ  বিবরণ সেদিনশহরবাসী না জানলেও ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারেরসংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ কথাটি শুনে উজ্জীবিত হয়েছিলো। ৮ মার্চ রেডিওতেপ্রচারিত ভাষণ শোনার পর শহর উত্তাল বিক্ষোভে গর্জে উঠেছিলো।

যারা ৭মার্চ তারিখের জনসভায় যোগ দিতে ঢাকা গিয়েছিলেন তারা ফিরে আসেন ৯ মার্চ। যেকোন একজন নিয়ে এসেছিলেন ঐতিহাসিক ভাষণের ক্যাসেট। এমপিএ ফজলুল করিম সাহেবেরবৈঠকখানা থেকে মাইকে শুরু হয় ক্যাসেট বাজানো। সে সময়ের প্রেক্ষাপটে এ ছিলযেন এক যাদুর বাঁশী। মানুষ ছুটে আসছিলো আর শুনছিলো সেই ভাষণ। অবিরাম এইগতিধারা চলছিলো তারপর থেকে।

ঐ দিনইঠাকুরগাঁও কলেজের তৎকালীন ভিপি মোহাম্মদ আলীকে আহবায়ক করে একটি ‘‘সর্বদলীয়ছাত্র সংগ্রাম কমিটি’’ গঠন করা হয়। এছাড়া কেবল ছাত্রলীগের কর্মীদের নিয়েগঠন করা হয় ‘জয়বাংলা’ বাহিনী যার নেতৃত্বে ছিলেন আনসারুল হক জিন্নাহ। একইদিন এস,এম আজিজুল হকের নেতৃত্বে গড়ে তোলা হয় আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী।

১০ মার্চতারিখে শহরের সর্বত্র কালো পতাকা উত্তোলন করা হয়। সংগ্রাম পরিষদেরনেতৃবৃন্দের আহবানে হাইস্কুলের শিক্ষক এম, ইউসুফ এগিয়ে আসেন ছাত্র যুবকদেররাইফেল ট্রেনিং দিতে। তিনি ছিলেন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। রোভার স্কাউট এবংইউ.ও.টি.সি ক্যাডেটদের জন্য নির্ধারিত ৫০ টি ডামী রাইফেল দিয়ে শুরু হয়প্রশিক্ষণ। সকালে হাইস্কুল মাঠে এবং বিকেলে পাবলিক লাইব্রেরীর মাঠেপ্রশিক্ষণ চলে প্রায় ২০০ ছাত্র-যুবকের।

১১ মার্চবৃহস্পতিবার, তৎকালীন এমপিএ এ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলাম ঢাকা থেকে ফিরে জনতারমিছিলে যোগ দেন এবং তৎকালীন মহকুমা প্রশাসক তসলিম উদ্দিন আহমেদকেছাত্র-জনতার সাথে একাত্ম হয়ে আন্দোলনকে গতিশীল ও সার্বিক সহযোগিতা করতেআহবান জানান। ৭ মার্চের ভাষণের পর দেশের প্রায় জেলখানাই খুলে দেয়া হয়েছিলোকয়েদীদের বের হয়ে আন্দোলনে শরীক হতে। তারই ধারাবাহিকতায় ঐদিন ঠাকুরগাঁওয়েরজেলখানা খুলে দেয়া হয় এবং কয়েদীরা অনেকে আন্দোলনে শরীক হয়।

১২ মার্চতারিখে মহিলা আওয়ামীলীগের উদ্যোগে মহিলাদের একক মিছিল বের হয়। মিছিলেমুর্শেদা করিম, সৈয়দা জাহানারা, শক্তি বর্ধন, দীপ্তিবর্ধন, শান্তি রাণীঘোষ, লায়লা শামীম রোজী, কামরুন্নাহার জলি, মিসেস ফরিদা লতিফ, রুবি, মঞ্জুইসলাম, ছবি সেন গুপ্তা, ভারতীয় গুহ ঠাকুরতা, উষাদি, শরীফা সাত্তার, কালীবাবুর স্ত্রী ও গোসাইবাবুর স্ত্রী অক্লান্ত পরিশ্রম করে মহিলাদের সংগঠিতকরেছিলেন। মহিলাদের হাতে ছিল দা, বটি ও ঝাড়ু। ভাবতে অবাক লাগে মহিলাদের এইমিছিলে স্থানীয় উপজাতি মহিলারাও তীর ধনুক হাতে অংশ নিয়েছিলো।

১৫ মার্চতারিখে প্রকাশিত ‘দৈনিক পাকিস্তান’ পত্রিকায় প্রকাশিত বঙ্গবন্ধুর একটিবিবৃতি ও দেশের প্রশাসন ব্যবস্থা চালু রাখার জন্য জারীকৃত ৩৫টি বিধির আলোকেঠাকুরগাঁওয়ের সব সরকারী-আধা সরকারী অফিস আদালত এবং ব্যাংক-বীমা তাদের কাজচালাতে শুরু করে।

১৬ মার্চথেকে ২২ মার্চ পর্যন্ত প্রতিদিন রাইফেল ট্রেনিং, গণজমায়েত, মিছিল এবংবিকেলে পাবলিক লাইব্রেরী মাঠে জনসভা ও সন্ধ্যায় দেশাত্ববোধক গান, গণসংগীত ওবিচিত্রানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। স্থানীয় বুদ্ধিজীবী, ছাত্র-ছাত্রী ওসংগীত শিল্পীগণ এতে অংশ নিয়েছেন।

এদিকে ২৩মার্চকে সামনে রেখে ব্যাপক তোড়জোড় শুরু হয় বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত নতুনপতাকা তৈরী করে উড়ানোর। ফালু খলিফার সার্বিক তত্ত্বাবধানে ৬/৭ দিনেই তৈরীহয়ে যায় প্রায় ১০০০ পতাকা। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা এসব পতাকার কাপড় সরবরাহকরেছিলেন।

একই সাথেমহকুমার অন্য ৯টি থানাতেও আন্দোলন তীব্র থেকে তীব্রতর আকার ধারণ করেছিলো।স্থানীয় প্রগতিশীল ও স্বাধীনতার স্বপক্ষের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ নিজেদেরএলাকায় জনমত গঠন, মিছিল ও সমাবেশের আয়োজন করেছেন। ঠাকুরগাঁও শহর থেকেসংগঠনের নেতৃবৃন্দ এসব সমাবেশে গিয়ে ভাষণ দিয়েছেন।

২২ মার্চতারিখে স্মরণকালের সর্ববৃহৎগণমিছিল বের হয়। আওয়ামী লীগ, ন্যাপ, কমিউনিস্টপার্টি, কৃষক সমিতির সব অঙ্গসংগঠন, ঠাকুরগাঁও সুগার মিল, ওয়াপদার শ্রমিকসংগঠনের নেতাকর্মীসহ সাধারণ মানুষ এতে অংশ নেন। সন্ধ্যায় বের হয় মশালমিছিল। রাতেই বিতরণ করা হয় নতুন পতাকা।

২৩মার্চকে আগেই ঘোষণা দেয়া হয়েছিলো ‘প্রতিরোধ দিবস’ হিসেবে পালনের। ২৩ মার্চছিল পাকিস্তান দিবস। এস, এম আসগর আলী এবং জর্জিসুর রহমান খোকাসহ বিপুলসংখ্যক ছাত্রজনতা ২৩ মার্চের সূর্যোদয়ের সাথে সাথে মহকুমা প্রশাসকেরকার্যালয়ে পতাকা উড়ানোর প্রত্যয় নিয়ে রাত কাটান ফজলুল করিম সাহেবেরকাচারিতে। প্রত্যুষে দলবল নিয়ে মিছিল সহকারে রেজাউল হক বাবুলসহ তিনজনে মিলেমহকুমা প্রশাসকের কার্যালয়ের উপর পতাকা উত্তোলন করেন। নিচে অগনিত মানুষ।এরপর থানা ভবনে গিয়ে পতাকা উত্তোলনে অবাঙালী প্রহরী কর্তৃক বাধাপ্রাপ্তহলেও তৎকালীন ওসি আবদুল গফুর নিজেই পতাকা উত্তোলনের ব্যবস্থা নেন।

২৪মার্চের গণ মিছিল ও গনজমায়েতসহ সর্বত্র শোভা পাচ্ছিলো নতুন পতাকা। ২৫তারিখে মহকুমা প্রশাসকের কার্যালয়ে কে যেন পাকিস্তানী পতাকা উড়িয়েছিলো এবংপরে তা নামিয়ে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিলো উত্তেজিত জনতা। সেখানে আবারোটানিয়েছিলো বাংলাদেশের পতাকা।

২৬ মার্চসকাল থেকেই ঢাকার সাথে টেলিযোগাযোগ সম্ভব হচ্ছিলো না। মিছিল মিটিং আগেরমতোই চলছিলো। আকাশবাণী, বিবিসি ও ভয়েস অব আমেরিকা থেকে যাবতীয় খবর অবগতহয়েছিলো সবাই। ২৫ মার্চের অপরাশেন সার্চলাইট শুরু হবার পর থেকে বাঙালী নিধনও আন্দোলন নস্যাত করতে পাকিস্তানী শাসকদের কার্যক্রম প্রত্যক্ষভাবে প্রকাশপায়। শাসকগোষ্ঠীর অধীনে সেনাবাহিনী, তৎকালীন ইপিআর ও পুলিশ বাহিনীতেকর্মরত বাঙালী ও অবাঙালীদের পৃথকীকরণের কার্যক্রম চলে। এরই ঢেউ এসে লাগেইপিআর এর দিনাজপুর সেক্টরের অধীনে ঠাকুরগাঁয়ের ৯ম উইং-য়ে। ঠাকুরগাঁওস্থ ৯মউইং-এর কমান্ডার ছিলেন পাঞ্জাবী অফিসার মেজর মোহাম্মদ হোসেন এবং সেকেন্ড ইনকমান্ড ছিলেন অবাঙ্গালী ক্যাপ্টেন নাবিদ আলম। দিনাজপুর সেক্টরের দায়িত্বেছিলেন পাঞ্জাবী অফিসার লে: কর্ণেল তারেক রসূল কোরাইশী। ৯ম উইং-এর বাঙালীদেরমধ্যে সবেচেয়ে বড় অফিসার ছিলেন সুবেদার মেজর কাজিম উদ্দিন এবং সাধারণসিপাহীদের সিংহভাগই ছিলেন বাঙালী।

সত্তরেরনির্বাচনের সময় থেকে প্রচুর সামরিক সম্ভার নিয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ২৬তম এফ,এফ এর একটি কোম্পানী দিনাজপুর সার্কিট হাউজে অবস্থান করছিলো। তারাসারাদেশে যোগাযোগের জন্য কুঠিবাড়ি ইপিআর ক্যাম্পে একটি শক্তিশালী ওয়্যারলেসসেট স্থাপন করেছিলো। ৭ মার্চের ভাষণের পর থেকে অবাঙালী এসব অফিসার ওজোয়ানদের গোপন তৎপরতা পরিলক্ষিত হচ্ছিলো।

২৫ মার্চতারিখে মেজর মোহাম্মদ হোসেন ছিলেন পঞ্চগড় এলাকার সীমান্ত চৌকি পরিদর্শনে।দিনাজপুর সেক্টরের জরুরী বৈঠকে যোগ দেন ক্যাপ্টেন নাবিদ আলম। বৈঠকটি হয়অত্যন্ত গোপনীয় এবং সেখানে বাঙ্গালী অফিসার ও জোয়ানদের ভৎর্সনা করা হয়। ২৬মার্চ সকালে মেজর মোহাম্মদ হোসেন ও ক্যাপ্টেন নাবিদ আলম একত্রিত হয়ে উইং-এরসব জেসিওদের মিটিং ডাকের। মেজর সাহেব সমবেত সবাইকে পাকিস্তান সরকারেরজারীকৃত ফরমান পাঠ করে শোনান ও বাঙালীদের আন্দোলনের প্রতি কটাক্ষ করেবক্তব্য রাখেন। মনে মনে প্রতিশোধ গ্রহণের প্রবল ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও কোনবাঙ্গালী জেসিও কোন কথা বলতে পারেননি। তাদের কাছে বাইরের পরিস্থিতি ছিলসম্পূর্ণ অজানা।

উইংকমান্ডারের নির্দেশে ইপিআর-এর টহল শুরু হয়। জনতা রাস্তায় রাস্তায় বেরিকেডদেয়া শুরু করে। ইপিআরদের টহল গাড়ীতে এদিন বাঙালি ও অবাঙালি উভয়ই ছিলো।বেরিকেড সরিয়ে তাদের টহল চলছিলো। ২৬ তারিখ সন্ধ্যায় মাইকিং করে সারা শহরেসান্ধ্য আইন বা কার্ফূ জারি করা হয়। কিন্তু কে শোনে কার নির্দেশ। উত্তালজনতা কার্ফূ ভঙ্গ করে মিছিল বের করে। সবারই লক্ষ্য কন্ট্রোল রুম থেকে কিনির্দেশ আসে। কিন্তু ঢাকার সাথে কোন যোগাযোগ রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছিলো নানেতৃবৃন্দের। অনেকের মুখে শোনা যাচ্ছিলো সংগ্রাম পরিষদের অব্যবস্থার কথা। এসময় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ বলিষ্ঠ ভূমিকা নিয়েছিলেন। ২৬ মার্চ সবার রাত কাটেভীতিকর অবস্থায়। তবুও রফিউল এহসানের বাসায় নেতৃবৃন্দ গোপনে বৈঠকে বসেনরাতে।

পরদিন ২৭মার্চ। কার্ফূ ভঙ্গ করে যথারীতি জনতার ভিড় হয় ফজলুল করিম সাহেবের কাচারিরবা কন্ট্রোল রুমের সামনে। সেখান থেকে বের হয় মিছিল। সাউথ সার্কুলার রোড(চৌরাস্তা থেকে কালী বাড়ী মোড় পর্যন্ত) ধরে মিছিল এগিয়ে চলে কালী বাড়িরদিকে। ওদিকে ইপিআর ক্যাম্প থেকে একটা জীপে করে শহরের পরিস্থিতি দেখতে বেরহয় মেজর মোহাম্মদ হোসেন, সুবেদার মেজর কাজিম উদ্দিন এবং ক্যাপ্টন নাবিদআলম। তাদের পেছনের পিকআপ গাড়িতে ছিল ৮/১০ জন ইপিআর। একদিকে মাইকে ৭ মার্চেরভাষণ অন্যদিকে মিছিলের নানা শ্লোগানের এক পর্যায়ে কেরামত আলী মোক্তারসাহেবের বাসার সামনে আসে মিছিল। এখানে মুখোমুখি হয় মেজরের জীপ, টহলদারপিকআপের ইপিআর এবং জনতার। ঠাকুরগাঁয়ের তৎকালীন সিও ডেভ (যিনি ১৯৭০ থেকেঠাকুরগাঁয়ে কর্মরত ছিলেন) আবদুল ওহাব আন্ধার মানিক ১৯৭২ সালে তার ‘অমরকাহিনীকার’ নামক গ্রন্থে ‘শহীদ মোহাম্মদ আলী সড়ক’ নামক সংবেদনশীল নিবন্ধেলিখেছেন-‘‘বেলা ১২ টা বেজে ১০ মিনিট। কেরামত আলী মোক্তার সাহেবের বাসারসামনে মিছিলটি এসে থেমে গেল। দক্ষিণ দিক থেকে দ্রুতবেগে ধেয়ে আসছিল একটিজীপ ও এক লরী সৈন্য। মেজরের জীপটা এসেও সামনে থামলো। উইং কমান্ডার মেজরমোহাম্মদ হোসেন ও ক্যাপ্টেন নাবিদ আলম জীপ থেকে নামলেন। তাদের দেখে মিছিলেঅংশগ্রহণকারী জনতা যেন বারুদের মত জ্বলে উঠলো। মিছিল থেকে অসীম সাহসী, বলিষ্ঠ দেহী, মুখে চাপদাড়ি মধ্য বয়সের মোহাম্মদ আলী নামের এক রিকসাচালকসবার সামনে চলে আসে। মেজর মোহাম্মদ হোসেনের সামনে গিয়ে দৃপ্ত ওঅকুতোভয়-স্পষ্ট আওয়াজে চিৎকার দিয়ে ওঠে-জয়বাংলা। সাথে সাথেই পরপর তিনটাগুলির শব্দ হলো। একটা বিকট চিৎকার দিয়ে লুটিয়ে পড়লো একটি দেহ।‘‘ঠাকুরগাঁয়ের প্রথম শহীদ মোহাম্মদ আলী।’’ গাড়ীতে উঠে মেজর তার সৈন্যসামন্তনিয়ে ইপিআর ক্যাম্পে ফিরে গেল।

পাঞ্জাবীমেজরের এহেন বর্বরোচিত কর্মকান্ডে তাৎক্ষণিকভাবে মিছিল ও জনগণ ছত্রভঙ্গ হয়েগেলেও কয়েক মিনিটের মধ্যে আবার জড়ো হলো। খবর ছড়িয়ে পড়লো গোটা শহরে। জনতাঘর ছেড়ে বেরিয়ে এলো রাস্তায়। এবার সিদ্ধান্ত হলো ইপিআর ক্যাম্প আক্রমনের।শহীদ মোহাম্মদ আলীকে রাস্তার পূর্বপাশেই দাফন করা হলো। মেজর মোহাম্মদ হোসেনক্যাম্পে ফিরে গিয়ে পরিস্থতি সামাল দেবার জন্য সুবেদার মেজর কাজিমউদ্দিনের নেতৃত্বে তিন লরী ইপিআর প্রেরণ করে। ওদিকে শোকে বিহবল জনতার মিছিলধেয়ে চলছিলো ইপিআর ক্যাম্পের দিকে। অবস্থার ভয়াবহতা চিন্তা করেকাজিমউদ্দিন নিচে নেমে অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় সামনের সারির কয়েকজন নেতারসাথে কথা বলেন এবং তাদের পরিকল্পনা ও পরিস্থিতির বর্ণনা দেন। জনতা শান্তহয়। মিছিল আবারো ফিরে আসে। রাস্তায় রাস্তায় বড় বড় গাছ কেটে বেরিকেড তৈরীহয়। সন্ধ্যায় আবারো কার্ফূ্য জারী করা হয় মাইকে। ক্যাম্পের মধ্যে সুবেদারমেজর কাজিম উদ্দিন গোপন আলোচনায় বসেন সুবেদার হাফিজ, সুবেদার আতাউল, নায়েবসুবেদার মতিউর রহমান, হাবিলদার আবু তালেব ও নায়েক আব্দুল হাকিমকে নিয়ে।

২৮ মার্চরোববার। প্রচন্ড রোদের মধ্যেও আবারো মিছিল-বিক্ষোভ। মিছিল গিয়ে জনসভায় রূপনেয় ঠাকুরগাঁও হাইস্কুল মাঠের অশ্বত্থ তলায়। এফ,এ মোহাম্মদ হোসেনেরসভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় ভাষণ দেন আসগর আলী, আনোয়ার হোসেন, জর্জিসুররহমান, রেজাউল হক, বজলার রহমান, আবদুল লতিফ মোক্তার, আবদুর রশীদ মোক্তারএবং সিরাজুল ইসলাম এমপিএ। জনসভায় ঘোষণা করা হয় আজ থেকে কন্ট্রোলরুম করাহলো- এসডিও অফিসের সামনের বটতলায় দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট একটি টালীর ঘরকে। মিটিংশেষে মিছিল করে জনতা সেখানে যায়। তখন বেলা ৩টা। ইপিআরের একটি টহল গাড়িগোয়াল পাড়ার কাছ দিয়ে যাচ্ছিলো। গাড়ি দেখে পশ্চিম পাশে একটি কুঁড়ে ঘর থেকেএকটি ৭/৮ বছরের শিশু চিৎকার দিয়ে উঠেছিল ‘জয়বাংলা’। চিৎকারের শব্দ লক্ষ্যকরে টহল গাড়ি থেকে রাইফেলের গুলি ছোড়া হলে ঘটনাস্থলে নিহত হন হলপাড়ারসন্তুকী চৌহানের শিশু পুত্র নরেশ চৌহান-পাঁচ মিনিট আগেই যে আরেকটি শিশুরসাথে রাস্তায় দৌড়াদৌড়ি করছিলো। নরেশ চৌহানকে ধর্মীয় মতে সৎকার করারও সাহসহয়নি তাদের। ভয়ে কেউ এগিয়েও আসেনি। দ্রুত বাড়ির সামনে রাস্তার পূর্বপাশেতাকে সমাহিত করা হয়।

এ ঘটনায়শহরবাসী আরো বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। সংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দ অনেকখানি মুষড়েপড়েছিলেন। তবুও তারা যোগাযোগ করেন সুবেদার মেজর কাজিম উদ্দিনের সাথে। ওদিকেমেজর মোহাম্মদ হোসেন ও ক্যাপ্টেন নাবিদ আলম, অবাঙালী ইপিআরদের নিয়ে গোপনেবৈঠক করে রাত পৌনে এগারোটায় সমস্ত বাঙালী সৈন্যদের হত্যা করার পরিকল্পনাকরে। এ খবর টের পেয়ে যান সুবেদার হাফিজ। ফলে তাঁরাও নিজেদের মধ্যে আলোচনাকরে পাঞ্জাবীদের আক্রমণের আগেই আক্রমন চালিয়ে সমস্ত অবাঙালী ইপিআরদের হত্যাকরার পরিকল্পনা গ্রহণ করেন এবং সেভাবেই কাজ হতে থাকে।

রাত ১০ টা১৮ মিনিট। পরিকল্পনা মোতাবেক সুবেদার হাফিজের স্টেনগানটা গর্জে ওঠার সাথেসাথেই অন্যান্য সব বাঙালী সেনাদের কাছে রক্ষিত হাতিয়ারগুলো গর্জে ওঠে। ভীতহয়ে পড়ে শহরের সাধারণ মানুষ। কিন্তু যখন শোনা গেল ‘জয়বাংলা’ শ্লোগান এবংসাধারণ মানুষকে এগিয়ে এসে সহায়তা করার উদাত্ত আহবান তখন মানুষ ছুটে এলোরাতের অন্ধকার সত্ত্বেও। জনগণ তাদের সাধ্যমত খাবার ও পানি নিয়ে এগিয়ে আসেন।সারারাত এভাবে অবাঙালীদের খুঁজে খুঁজে হত্যা করা হলো। পরের দিন খোচাবাড়ীতেসস্ত্রীক ক্যাপ্টেন নাবিদ আলমকে এবং ৩০ মার্চ তারিখে সস্ত্রীক মেজরমোহাম্মদ হোসেনকে তার বাংলোতে হত্যা করা হয়।

২৮মার্চের রাতের ঘটনার পর আন্দোলন ও সশস্ত্র সংগ্রামের কেন্দ্র বিন্দুতে চলেআসেন সুবেদার মেজর কাজিম উদ্দিন। তিনি সংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দের সাথেবৈঠকে বসেন ২৯ তারিখে। সামনের দিনগুলোর ভয়াবহতা এবং সৈয়দপুর ক্যান্টনমেন্টথেকে সাজেয়া বাহিনী ও আকাশ পথে বিমান আক্রমনের সম্ভাব্যতা সকলকেভীতসস্ত্রস্ত করে তুলে।

২৯ মার্চসব দিকের যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। এ সময় যে সমস্ত সামরিক ও আধাসামরিকসেনাসদস্য ছুটিতে ছিলেন বা যারা পালিয়ে বেঁচেছেন তারা এসে যোগ দিলেনকন্ট্রোলরুমে। একটা নিয়মিত বাহিনীর মত করে অগ্রগামী দল হিসেবে প্রতিরক্ষাব্যুহ রচনা করা হলো ভাতগাঁও ব্রীজের কাছে। সে পর্যন্ত রাস্তার পাশ ধরেপরিখা খনন ও গাছ কেটে বেরিকেড তৈরীর কাজ চলে পুরোদমে।

আবারোশুরু হলো রাইফেল ট্রেনিং। এবার আর ডামী দিয়ে নয়। এবার মূল রাইফেল দিয়ে।ইপিআরদের অস্ত্রগারের সমস্ত হালকা অস্ত্র একদিনের মধ্যে চলে আসলো সাধারণমানুষের হাতে। বিওপিতে কর্মরত অবাঙালী ইপিআরদের নিরস্ত্র ও হত্যা করা হয়।প্রতিরক্ষা ব্যুহতে নিয়োজিত মুক্তিযোদ্ধা ও এদিকে যারা সারা দিনব্যাপীট্রেনিং দিচ্ছিলো, পরিখা খনন করছিলো, বেরিকেড সৃষ্টিসহ বিভিন্ন কাজেনিয়োজিত ছিল তাদের যথাসময়ে খাবার সরবরাহের জন্য ২টি লঙ্গরখানা খোলা হয়।ডিফেন্সের জন্য খাবার তৈরী হয় ঠাকুরগাঁও সরকারি বালিকা বিদ্যালয় মাঠে- যারাদায়িত্বে ছিলেন নূরুল ইসলাম ছুটু ও ফনি পালিত অন্যটি স্থাপিত হয়েছিলোসাধারণের জন্য সিরাজদ্দৌলা সড়কের বেলতলায়। অবস্থা আঁচ করতে পেরে ঐদিনইআওয়ামী লীগ নেতা আকবর হোসেন ও জগন্নাথ গুহ ঠাকুরতা মোটর সাইকেলে তেঁতুলিয়াহয়ে চলে যান শিলিগুড়ি। বাংলা বান্ধার ওপর ফুলবাড়িয়ার কংগ্রেস নেতা চন্ডীবাবুকে নিয়ে তারা তৎকালীন মন্ত্রী অরুন কুমার মৈত্রের বাসায় দেখা করে সঠিকঅবস্থা বর্ণনা করেন। সেখানে তখন তেঁতুলিয়ার কমিউনিস্ট পার্টির নেতা কামরুলহোসেনের সাথে দেখা হয়। তিনজনে মিলে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ ওসাংবাদিকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে সহায়তার আবেদন জানান। ভারতীয় লোকজনস্থায়ীভাবে ‘মুক্তিযুদ্ধ সংগ্রাম সহায়ক কমিটি’ গঠন করে ১ ট্রাক ভর্তি লবন, কয়েক ড্রাম তেল, চিনি, সিগারেট, ব্যাটারী, ডাল ও সাবান সাহায্য হিসেবেপাঠানোর ব্যবস্থা করেন।

ওদিকেদিনাজপুরের কুঠিবাড়ির ৮ নম্বর উইংও বাঙালিদের দখলে আসে সশস্ত্র সংগ্রামেরমাধ্যমে। ফলে ঠাকুরগাঁও দিনাজপুরের বাঙালি সেনা অফিসারের একত্রে সৈয়দপুরসেনানিবাস থেকে সম্ভাব্য আক্রমণ প্রতিহত করার উপায় খুঁজতে থাকলেন।

বিকেলেআব্দুর রশীদ মোক্তার ও বলরাম গুহ ঠাকুরতা কলকাতা রওয়ানা হয়ে যান সহায়তাপ্রাপ্তির আসায় এবং সুবেদার মেজর কাজিম উদ্দিন চলে যান ভারতের ৭৫ বিএসএফকমান্ডের কর্ণেল ব্যানার্জীকে এগিয়ে আসার আমন্ত্রণ জানাতে।

১ এপ্রিলকর্ণেল ব্যানার্জী ঠাকুরগাঁও আসেন। সিরাজুল ইসলাম এমপিএসহ তিনি শিবগঞ্জবিমান ঘাটি, ইপিআরদের অগ্রবর্তী ঘাঁটি পরিদর্শনসহ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাসম্পর্কে দিক নির্দেশনা দেন। বিদ্যুৎবিভাগের প্রকৌশলী মি: রেজা নিজেই ১০মাইলে স্থাপিত পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন স্টেশনের টাওয়ারে উঠে বিদুৎবাহী তারবিচ্ছিন্ন করে দেন। আবুল হাসনাত ভেলার নেতৃত্বে ঠাকুরগাঁও সুগারমিলেরশ্রমিকদের সহায়তায় জনগণ শিবগঞ্জ বিমান বন্দরের রানওয়েতে বিরাট বিরাট গাছকেটে ফেলে রাখেন।

২ এপ্রিল :শুক্রবার। পাবলিক লাইব্রেরীর মাঠে রাইফেল চালনা প্রশিক্ষণকালে সেখানে এসেসবার সাথে একাত্মতা ঘোষণা করেন অবসরপ্রাপ্ত মেজর এম.টি. হোসেন। এদিক থেকেতিনিই যুদ্ধ পরিচালনার দায়িত্ব পেয়ে যান। কামিজ উদ্দিন তাঁর সহকারী হয়েথাকলেন। এতে প্রতিরোধ ব্যবস্থায় জীবন ফিরে আসে। সৈয়দপুর সেনানিবাস থেকেপালিয়ে আসা বাঙালি অফিসার ক্যাপ্টেন আশরাফ ও ক্যাপ্টেন আনোয়ার যোগ দেনদিনাজপুর উইং এর সাথে। ক্যাপ্টেন আশরাফকে ঠাকুরগাঁও উইং এর সাথে যোগ দিতেমির্জা আলমগীর দিনাজপুর যান।

৩ এপ্রিল :শনিবার মেজর এম,টি হোসেন স্থানীয় ডাকবাংলোতে যুদ্ধ পরিচালনা সংক্রামত্মতাঁর অফিস স্থাপন করেন এবং অধীনস্ত জেসিও এনসিওদের দায়িত্ব বণ্টন করেন।প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার নতুন মাত্রা যোগ হয়। এলাকার যাবতীয় কার্যক্রম নিয়েউর্দুতে লিখা একটি চিঠি ধরা পড়ার প্রেক্ষিতে এদিন সবচেয়ে অবাঞ্চিত ঘটনাঘটে। অবাঙালি জনৈক লোকের হাতে প্রাপ্ত চিঠিতে সব গোপন তথ্য ছিল যা নাকিসৈয়দপুর সেনা নিবাসে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিলো। ফলে অবাঙালি হত্যা শুরু হয়। যাচলে পরবর্তী দুই দিন।

এর পরথেকে ভীতিকর অবস্থা নেমে আসে গোটা শহরে। অবাঙালীদের বাড়িঘরের সব মালামালএনে জমা করা হয় আদালত প্রাঙ্গণের কন্ট্রোল রুমে। এখানের সঠিক ইনচার্জ কেছিলেন আর শেষ অবধি কি কি মালামাল পাওয়া গিয়েছিলো তার কোন সঠিক হিসাব বাতথ্য কেউ পরবর্তীতে দিতে পারেননি।

৪ এপ্রিলতারিখ থেকে সাধারণ মানুষ আতংকগ্রস্ত হয়ে পড়ে। একদিকে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থারযেমন কোন খবর পাওয়া যাচ্ছিলো না অন্যদিকে অবাঙালি নিধনের জের কিভাবে কারউপর এসে পড়বে তা নিয়ে সবাই আলোচনা করছিলো। আগের দিনের চেয়ে আদালত প্রাঙ্গনেউৎসুক জনতার ভিড় কম মনে হলো। এদিন থেকেই নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ তাদেরপরিবার পরিজন শহর থেকে গ্রামের দিকে সরিয়ে দিতে শুরু করেন।

৫ এপ্রিলসকাল ১০ টা নাগাদ শহর ছিল প্রায় ফাঁকা। রাতারাতি অধিকাংশ শহরবাসীই তাদেরআত্মীয়-স্বজনদের গ্রামীণ এলাকায় সরিয়ে দিয়েছে বলে জানা যায়। ওদিকেপ্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে বেশকিছু গুজব ছড়িয়ে পড়ে যা ভীতিপ্রদ। ডাকবাংলোথেকে নির্দেশ পেয়ে মাইকে ঘোষণা করা হয় যে, যাদের কাছে রাইফেল আছে তারা যেনতা ডাকবাংলোতে জমা দিয়ে এন্ট্রি করে নেন এবং যুদ্ধে যোগদান করেন।

৬এপ্রিলের অবস্থা ছিলো আরো নাজুক। কন্ট্রোল রুম খোলার জন্য কোন দায়িত্ববানলোকও পাওয়া যাচ্ছিলো না। শহরের দোকানপাট বাড়িঘর পাহারা দেবার জন্য যারারাতে ছিলেন তারাও আদালত প্রাঙ্গনে আসতে আসতে দুপুর করে দিয়েছেন। সবার চোখেমুখে ছিল আতংক। ঢাকাসহ অন্য কোন জায়গায়ই কোন সঠিক খবর কেউ দিতে পারতো না।রাতে বিবিসি, বয়েস অব আমেরিকা এবং আকাশবাণীর সংবাদ ছিল মূল আকর্ষণ।

৭ এপ্রিল :বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে দিনটি স্মরণীয়। এদিন ‘দৈনিক বাংলাদেশ’ নামেএকটি সংবাদপত্রের প্রকাশ ঘটে। ঠাকুরগাঁও ওয়াপদার কর্মকর্তা কাজী মাজহারুলহুদা-পূর্বের বেশ কয়েকদিনের বাস্তব অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে সময়ের তাগিদেজনগণের মনোবল বৃদ্ধি ও ফ্রন্টলাইনের খবরসহ মুক্তিযুদ্ধ সংক্রান্ত বিশ্বজনমততুলে ধরার ব্যাপারে বেশ কয়েকজনের সাথে আলাপ করেন। ফলশ্রুতিতে স্থানীয়সুলেখা প্রেস থেকে ১/৮ ডিমাই সাইজের ৪ পৃষ্ঠার ৫০০ কপি পত্রিকা ছাপানো হয়।মূল্য ছিল ১০ পয়সা। একটি সংখ্যার ব্যানার হেড ছিল ‘গণচীন একটি কাগুঁজে বাঘ’ যা আকাশবানী থেকে দেবদুলাল বন্দোপাধ্যায় পাঠ করেছিলেন ও পত্রিকাটিরগুরুত্ব সম্পর্কে আলোচনা করেছিলেন। রাত জেগে গ্রুফ দেখা ও ছাপিয়ে পরের দিনসকালে পাঠকের হাতে তুলে দিতে বেশ বেগ পেতে হতো। এভাবে পর পর ৬টি সংখ্যা বেরকরা হয়। পত্রিকাটির গ্রহণযোগ্যতা ছিল বর্ণনাতীত। ২য় সংখ্যা থেকে ১০০০ কপিছাপানো হয়। পরবর্তীতে পত্রিকাটি পশ্চিমবঙ্গের ইসলামপুর শহর থেকে প্রকাশিতহয়। কবি আবুল হোসেন সরকারও কয়েকটি সংখ্যা সম্পাদনা করেছেন। স্বাধীনবাংলাদেশের এটিই প্রথম দৈনিক সংবাদপত্র।

৮ এপ্রিলথেকে ১৪ এপ্রিল : এই সাতদিন ছিল শহরবাসীর সবচেয়ে উৎকণ্ঠার দিন। কয়েকজনছাত্রনেতা ও কর্মী, কয়েকজন দোকানদার এবং ট্রেজারী ও থানা এলাকায় প্রহরীছাড়া কেউ রাতে শহরে থাকেননি। সকাল হলে অবস্থা বুঝে সংবাদ নিয়ে তারপরটাঙ্গনের এপাড়ে শহরে ঢুকেছেন সবাই। এসব দিনগুলোতে শহরের ফাঁকা অবস্থানিরসনে সকলকে নিজ নিজ গৃহে ফিরে আসার আহবান জানিয়ে মাইকে ঘোষণা প্রচার করাহয় ও ফিরে না এলে বাড়িঘর বাজেয়াপ্ত করা হবে বলেও জানানো হয়।

১৪ এপ্রিলরাতে স্থানীয় ‘ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান’ এর ভোল্ট ভেঙ্গে রাতের বেলায়সমস্ত টাকা পয়সা ট্রাকে করে নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো। শহরবাসী এ খবর জানতে পারে১৫ এপ্রিল। পয়সার বাক্সসহ দু’জনকে আটকও করা হয়েছিল। অবশ্য পরে সমস্ত ঘটনাজানা গিয়েছিলো। তথ্যমতে জানা যায় এ টাকা পরবর্তীতে মুজিবনগর সরকারের তহিবলেজমা হয়েছিলো।

১৫ এপ্রিল: বেলা ১১ টা। শহরে রাত যাপনকারী কয়েকজন লোক, কয়েকজন ছাত্র নেতাকর্মীউপস্থিত ছিলেন আদালত প্রাঙ্গণে। গ্রাম থেকে লোকজন এখনো পুরোপুরি আসেনি।মাইকে ঘোষনা করা হচ্ছিলো- পরিস্থিতি আমাদের নিয়ন্ত্রণে, আমাদের অগ্রগামীবাহিনী সৈয়দপুর ক্যান্টনমেন্টের কাছে পৌছে গেছে ইত্যাদি-ইত্যাদি।

হঠাৎশহরের দক্ষিণ প্রান্তে বিকট শব্দে একটা শেলের বিস্ফোরণ হলো। মানুষ তখনদিগবিদিক জ্ঞান হারা হয়ে ছুটতে শুরু করলো উত্তর দিকে। সবারই একউদ্দেশ্য-টাউন ছাড়তে হবে, টাঙ্গন নদীর ওপারে যেতে হবে। গ্রাম থেকে আরোপ্রত্যন্ত এলাকা হয়ে সীমান্তে পাড়ি জমানোর উদ্দেশ্যেমূলক নিরুদ্দেশ যাত্রারযাত্রী হয়ে পালাতে লাগলো সবাই। পিছনে তাকিয়ে অনেকেই দেখলো দাউ দাউ করেজ্বলছে এসডিও সাহবের বাংলো। গোটা শহরের আকাশে কেবল আগুনের কুন্ডুলী।

নিরাপদআশ্রয়ের উদ্দেশ্যে বালিয়াডাঙ্গী, আটোয়ারী, পঞ্চগড় ও হরিপুরের সীমান্ত এলাকাদিয়ে কয়েক হাজার মানুষ আশ্রয় নিলো ভারতীয় শরনার্থী শিবিরে। ২৫ মার্চের ২০দিন পর ঠাকুরগাঁও শহর শত্রু কবলিত হলো। এদিকে সৈয়দপুর সেনানিবাসের সাজোয়াইউনিট ও ট্যাংকের সামনে টিকতে না পেরে মুক্তিযোদ্ধারা একে একে পিছু হটেআসছিলো যা কেউই সাধারণ মানুষকে জানায়নি। সাধারণ মানুষ ছিল বেশ অসহায়।মুক্তিযোদ্ধারা পিছু হটতে হটতে পঞ্চগড়ে গিয়ে ডিফেন্স নেন। ২৯ এপ্রিলপঞ্চগড়ের পতন হয়। শেষ অবধি তেঁতুলিয়া থানার ভোজনপুরে চাওই নদীর ব্রীজভেঙ্গে দিয়ে উত্তর পাড়ে মুক্তিবাহিনী ডিফেন্স নিয়েছিলো। ভোজনপুর থেকে বাংলাবান্ধা পর্যন্ত বিস্তীর্ণ ৭৪ বর্গমাইলের তেঁতুলিয়া থানাটি ছিল সম্পূর্ণশত্রুমুক্ত। চাওই নদীর ব্রীজ ভাঙ্গা থাকার কারণে পাকিস্তানী সেনারা আরঅগ্রসর হতে পারেনি। তাছাড়া জগদল, মাগুরমারী, অমর খানা এলাকা নিতান্তইসীমান্তবর্তী বিধায় নিরাপত্তার দিক দিয়েও তারা এগুতে সাহসী হয়নি।

৭৪বর্গমাইলের এই তেঁতুলিয়াকে ঘিরে গড়ে উঠেছিলো মুজিবনগর ভিত্তিক বেসামরিকপ্রশাসন ব্যবস্থা। এখান থেকেই যুদ্ধ পরিচালনা করা হতো। বেশ কিছু দিনতেঁতুলিয়া ডাক বাংলোতে বসত করেছেন এম,কে বাশার। এখান থেকে আমার সম্পাদনায়প্রকাশ করা হয়েছিল ‘সাপ্তাহিক সংগ্রামী বাংলা’ যা স্বাধীনতাত্তোরকালেঠাকুরগাঁয়ের সার্বিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলো।

এর পরেরদিনগুলো প্রতিরোধের এবং সম্মুখ যুদ্ধের। অবরুদ্ধ শহরে খান সেনাদেরসহায়তাকারী কিছু অবাঙালি ও মালদাইয়াদের কারণে বেশ কিছু হত্যাকান্ড ঘটেছে।পীরগঞ্জ কলেজের অধ্যাপক গোলাম মোস্তফা, কোসা রাণীগঞ্জের সালাহ উদ্দিন, ফাড়াবাড়িতে পানির কূপে শহর আলী বহর আলীসহ ১৮ জন, ভাতারমারি ফার্মের পাশেহত্যাকান্ডসহ খুনিয়া দিঘি, জাটিয়া ডাঙ্গা, ওয়াপদা ওয়ার্কশপ, পায়েন্দানাচৌধুরী পাড়া, রুহিয়ার রামনাথ হাটসহ বিভিন্ন স্থানের হত্যা ও গণ কবর এবংবাঘের খাচায় নির্যাতনের ভয়াবহ শিকার হয়েছে ঠাকুরগাঁওবাসী।

ঠাকুরগাঁওএলাকার মানুষ বিহারের মুখ্যমন্ত্রী শ্রী কর্পুরী ঠাকুর ও পশ্চিম বঙ্গসরকারের মানবিক আচরণের জন্য থুকরাবাড়ি, রাজগঞ্জ কিশোরীগঞ্জ ভৈষপিটা, দাড়িভিট, পাটাগড়া, মাটিকুন্ডা ও ইসলামপুর শরনার্থী শিবিরে ঠাঁই নিয়েছিলেন।অনেকে বেসামরিক প্রশাসন ব্যবস্থার মধ্যে দেখতে ও মুক্ত ভূমিতে থাকারমানসিকতায় তেঁতুলিয়া থানা সদরে থেকেছেন।

এপ্রিলমাসের ৩০ তারিখে এমপিও সিরাজুল ইসলাম তাঁর পরিবার নিয়ে তেঁতুলিয়া আসেন এবংএখানেই শেষ অবধি ছিলেন। গোটা একটি থানা শত্রুমুক্ত থাকার সুবাদে বিদেশীগবেষক, সাংবাদিক ও পর্যটক এখানে এসেছেন। মুজিবনগর সরকারের সব পদস্থকর্মকর্তা ও নেতৃবৃন্দ এখানে এসেছেন। এক বার তো কথাই উঠেছিল-‘স্বদেশেরমাটিতেই রাজধানী’ ও প্রশাসন চালু করার। ভারতীয় সেনাবাহিনীর সার্বিকসহযোগিতায় যুদ্ধ পরিচালনা করা হয়। মহকুমার ১০টি থানার বিভিন্ন সীমান্তএলাকা দিয়ে মুক্তিযোদ্ধারা দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে যুদ্ধ করেছেন।

২১নভেম্বর থেকে সাজোয়া বাহিনী নিয়ে অগ্রসর হয়েছে মিত্রবাহিনী। ৩০ নভেম্বরপঞ্চগড় মুক্ত হয়। খান সেনারা পিছু হটতে থাকে অপূরণীয় ক্ষয়ক্ষতি করতে, ঠাকুরগাঁও শহর মুক্ত হয় ডিসেম্বরের ২ তারিখ রাতে অর্থাৎ৩ তারিখে।

সম্ভবত :বাংলাদেশের একমাত্র মহকুমা ঠাকুরগাঁও যা খান সেনাদের দ্বারা দখল হয়েছে পরেএবং মুক্ত হয়েছে সবার আগে। দীর্ঘ ৯ মাসের যুদ্ধ বললেও ঠাকুরগাঁও বাসী মাত্রসাড়ে সাত মাস অর্থাৎ৩২১ দিনের মাথায় স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেমের প্রথমস্বাধীন মহকুমার ঐতিহাসিক গৌরব নিয়ে মুক্তদেশের পতাকা উড্ডীয়ন করেছে।

সুত্রঃ ঠাকুরগাঁও জেলা


Share with :

Facebook Twitter